কিশোরগঞ্জ জেলায় চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলার নদী, খাল, বিল ও জলাশয়জুড়ে এখন চলছে পাট জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর ব্যস্ততা। তবে বাম্পার ফলনের আনন্দের মাঝেও কৃষকদের বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমিক সংকট ও শ্রমমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। অনেক এলাকায় নগদ টাকায় শ্রমিক না পেয়ে কৃষকরা পাটের আঁশ ছাড়ানোর পারিশ্রমিক হিসেবে দিচ্ছেন এক আঁটি পাটখড়ি।
বুধবার (২২ জুলাই) জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও পাট কাটা, কোথাও জাগ দেওয়া, আবার কোথাও আঁশ ছাড়ানোর কাজ চলছে। অধিকাংশ কৃষকের অভিযোগ, শ্রমিক সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ে পাট কাটতে ও আঁশ ছাড়াতে পারছেন না। এতে পাট বেশি বড় হয়ে গেলে আঁশের মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
করিমগঞ্জ উপজেলার কৃষক সাজ্জাদ মিয়া বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা শ্রমিক সংকট। সময়মতো পাট কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে, ফলে পাটের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
দেহুন্দা ইউনিয়নের কৃষক শহিদ খান জানান, পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানো—সব মিলিয়ে এটি অত্যন্ত শ্রমনির্ভর কাজ। বর্তমানে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এত ব্যয় বহন করে পাট চাষে লাভের পরিমাণ অনেক কমে যাচ্ছে।
আরেক কৃষক মাসুদ মিয়া বলেন, কয়েক বছর আগের তুলনায় কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেকেই বিকল্প পেশায় চলে যাওয়ায় মৌসুমি শ্রমিকের সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে পাট কাটার মৌসুমে চাহিদা বাড়লেও প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
করিমগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের রাস্তার দুই পাশ, খাল-বিল ও বাড়ির আঙিনায় এখন পাট শুকানোর দৃশ্য চোখে পড়ছে। পুরুষদের পাশাপাশি নারী ও শিশুরাও পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে অংশ নিচ্ছেন। নদী-নালায় পর্যাপ্ত পানি থাকায় এবার পাট জাগ দিতে কৃষকদের তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। ফলে পাটের আঁশের রঙ ও গুণগত মানও ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
শ্রমিকের উচ্চ মজুরির কারণে অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক নগদ অর্থের পরিবর্তে ভিন্ন পদ্ধতিতে পারিশ্রমিক দিচ্ছেন। পাটের আঁশ ছাড়িয়ে দেওয়ার বিনিময়ে শ্রমিকদের দেওয়া হচ্ছে ওই পাটের শুকনো খড়ি বা পাটকাঠি। অর্থাৎ প্রতি আঁটি পাটের আঁশ ছাড়ানোর বিনিময়ে শ্রমিক পাচ্ছেন এক আঁটি পাটখড়ি।
পাট ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত কয়েকজন দিনমজুর ও গৃহিণী জানান, গ্রামাঞ্চলে জ্বালানি হিসেবে পাটখড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অনেক পরিবারে রান্নার প্রধান জ্বালানি এটি। তাই নগদ টাকা না পেলেও তারা পাটখড়ি সংগ্রহ করছেন, যা সারা বছর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে অথবা পরে বিক্রি করে নগদ অর্থও পাওয়া সম্ভব।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়া এবং সময়মতো সার ও মানসম্মত বীজ সরবরাহের কারণে এ বছর করিমগঞ্জে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। নদীমাতৃক ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সহজেই পাট জাগ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বাজারে পাটের ভালো দাম বজায় থাকলে কৃষকেরা এ বছর লাভবান হবেন বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
ইউ