সিএনজিতে দীর্ঘ লাইন, এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটিরাজধানীসহ সারাদেশে তীব্র গ্যাস সংকট

ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় রাজধানীজুড়ে তীব্র সিএনজি সংকট দেখা দিয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাপ তৈরি হয়েছে এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস মিলছে না। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত যানবাহনের চালক, গণপরিবহন খাতের কর্মী ও যাত্রীরা। সংকটের প্রভাব পড়েছে চালকদের আয়-রোজগারেও।
রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গ্যাস সংগ্রহের জন্য দিন-রাত দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছেন চালকেরা। অনেক পাম্পে রাত থেকেই গাড়ির লাইন শুরু হচ্ছে। গ্যাস সংগ্রহের জন্য দিন-রাত দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছেন চালকেরা। অনেক পাম্পে রাত থেকেই গাড়ির লাইন শুরু হচ্ছে। একাধিক সিএনজি চালিত গাড়ির চালক জানান, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দিনের বড় একটি সময় পাম্পেই কাটছে, যা তাদের স্বাভাবিক আয় ব্যাহত করছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চালকেরা। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রাইড-শেয়ারিং সেবার সঙ্গে যুক্ত অনেক চালক বলছেন, সময়মতো গ্যাস না পাওয়ায় তারা যাত্রী পরিবহন করতে পারছেন না। এতে দৈনিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
চালকদের অভিযোগ করেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তাদের দাবি, অতীতেও জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে সংকট দেখিয়ে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে বলে তাদের আশঙ্কা।
অন্যদিকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মালিকরাও। তারা দ্রুত এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক করে সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
মোহাম্মদুরে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আমিরুল বলেন, গ্যাস না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ঘুরতে হচ্ছে। কোথাও আবার এত দীর্ঘ লাইন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে গাড়ি চালানোর সময় কমে যাচ্ছে, আয়ও অর্ধেকে নেমে এসেছে। তিনি আরোও বলেন, ‘ভোর ৪টা থেকে কয়েকটি স্টেশনে ঘুরছি। কোথাও গ্যাস নেই, কোথাও বিশাল লাইন। দুপুর ১২টায় ২০০ টাকার সিএনজি পেয়েছি। এতে সংসারের খরচ চলবে কীভাবে বুঝতে পারছি না ‘
ফার্মগেটে একজন চালক বলেন, আজ(গতকাল) সকাল থেকে বিভিন্ন স্টেশনে ঘুরেও গ্যাস নিতে পারিনি। গাড়িতে থাকা সামান্য গ্যাসও শেষ হয়ে গেছে। গতকাল সারাদিনে মাত্র ২৫০ টাকা আয় করেছি। আজও যদি গ্যাস না পাই, তাহলে পুরো দিনের আয় নষ্ট হবে। প্রতিদিনের আয়ের ওপরই পরিবার চলে। দিনের অর্ধেক সময় যদি গ্যাসের লাইনে কাটে, তাহলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সদস্য মো. ওয়াহিদ খান বলেন, ‘সাধারণত স্টেশন পরিচালনার জন্য ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে অনেক জায়গায় মাত্র ৪ থেকে ৫ পিএসআই, এমনকি কোথাও ২ পিএসআইয়েরও নিচে নেমে গেছে।’
সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, ‘অনেক এলাকায় চাপ ১ থেকে ২ পিএসআই হওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্রাহকেরা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না।’ঢাকা জেলা সিএনজি চালক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হওয়ায় অনেক চালক দৈনিক আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারছেন না।’
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনালটির সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (৪৫ কোটি ঘনফুট) গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। ফলে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগ:
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক বাসাবাড়িতে দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা যাচ্ছে না। মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডের বাসিন্দা আজগর আলী বলেন, ‘গতকাল রাত ১২টায়ও গ্যাস পাইনি, চাপ খুব কম। কয়েকদিন থেকে সকালেও পাওয়া যাচ্ছেনা। ভোরবেলা নিভু নিভু গ্যাস পেলেও শুধু ভাত রান্না করতেই এক ঘণ্টা লেগেছে। অন্য কোনো রান্না করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত গরম ভাত পান্তা বানিয়ে পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে সবাই খেয়েছি।’সেখানকার আরেক বাসিন্দা কামরুন্নাহার বলেন, চুলায় গ্যাস নেই। ইন্ডাকশন কুকার বা গভীর রাতে রান্না করতে হয়। মধ্যরাতে গ্যাস আসলেও আগুন খুবই কম জ্বলছে। রান্না করতে স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে।’
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার বা গভীর রাতে রান্নার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
শিল্পেও প্রভাব:
গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রেও চাপ তৈরি হয়েছে। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য অন্তত ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ প্রয়োজন হলেও একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সেই পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘তিতাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। দুর্ঘটনার আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, বর্তমানে তা কমে ১২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে বিভিন্ন খাতে সরবরাহ সীমিত করতে হচ্ছে।’
কী ঘটেছে :
বাংলাদেশে বর্তমানে এলএনজি আমদানি ও পুনর্গ্যাসীকরণের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে সামিট, অন্যটি এক্সিলারেট এনার্জি। সামিট তাদের কাজ পুরো দমে করছে। তবে, গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এর পর থেকেই জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। স্বাভাবিক সময়ে দুটি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কমে গেছে।
গত বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকা টার্মিনাল চালু করা নিয়ে এক্সিলারেটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলার দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, এলএনজির ঘাটতি নেই। নতুন এলএনজি নিয়ে আসা জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। টার্মিনাল ঠিকঠাক হলে জাহাজটি আনা হবে। এক্সিলারেটের টার্মিনালে দুটি বয়লার আছে। আগুনে একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অক্ষত বয়লারটি চালু করা গেলে আরও ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যাবে। তাই এটি দ্রুত চালু করতে বলা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামত করতে ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা বাংলাদেশে এসেছেন। তারা কাজও শুরু করেছেন। অপারেশন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী দৈনিক ডেসটিনিকে বলেন, ‘ইংল্যান্ড থেকে বিশেষজ্ঞরা এসে কাজ শুরু করেছেন। এই ইশ্যুটি ট্যাকনিক্যাল হওয়ায় কবে নাগাদ চালু হবে তা বলতে পারছিনা।’
সূত্র জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞরা কাজ শুরু করছে তাই দ্রুত টার্মিনাল সচল করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছে?:
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট দেশের এলএনজি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে এসেছে। মাত্র দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল থাকায় একটি বন্ধ হয়ে গেলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে।
বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হোসেন দৈনিক ডেসটিনিকে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যতে একটি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দিলেও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে না।
তিনি আরোও বলেন, ‘ যে কোন টার্মিনালে ত্রুটি বা কোন সমস্যা একটা হতেই পারে। এই কারণে আমাদের প্র্যাকটিস হচ্ছে আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ইউনিট, ইকুইপমেন্ট বা ডিভাইসগুলোকে একটা করে ব্যাকআপ বা অল্টারনেটিভ রাখি যাতে করে একটাতে সমস্যা হয়ে গেলে আরেকটা ব্যবহার করা যায়। আমাদের তো দুইটা টার্মিনালÍএকটা হচ্ছে এক্সিলারেট এনার্জি (আমেরিকানদের) আর একটা হচ্ছে সামিট গ্রুপের। এই দুইটাই কিন্তু চলমান। প্রত্যেকটার সাথে একটা করে ব্যাকআপ রাখলে এমন সমস্যা মোকাবেলা করা যেত ।’
ড. ইকবাল বলেন, ‘সবচাইতে ভালো হতো যদি আরেকটা টার্মিনাল থাকতো। তবে, এখন আমাদের ল্যান্ডবেসড টার্মিনাল করা খুবই জরুরি। এই ল্যান্ডবেসড সিস্টেমটাকে আমাদের দ্রুত করতে হবে। কারণ আগামী ১০-১৫ বছর আমাদের এলএনজির ডিমান্ড থাকবেই।’
এদিকে, কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানায়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাস সংকট ও জনভোগান্তি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউ

শাফিউল আল ইমরান
© 2026 দৈনিক ডেসটিনি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।










