মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আঁচ এবার গিয়ে ঠেকেছে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সীমান্তবর্তী কাস্পিয়ান সাগরে। ইউক্রেনের হামলায় কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে এক নতুন ও বিপজ্জনক সংযোগ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের শঙ্কা, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের পর এবার কাস্পিয়ান সাগরও আঞ্চলিক সংঘাতের নতুন রণক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। কাস্পিয়ান সাগরে হামলার ঘটনা ও ইরানের প্রতিক্রিয়া ইরানের দাবি অনুযায়ী, সম্প্রতি কাস্পিয়ান সাগরে ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলায় একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এই হামলায় একজন নাবিক নিহত এবং অন্তত একজন আহত হয়েছেন। ঘটনাটিকে "শত্রুতাপূর্ণ ও অপরাধমূলক" আখ্যা দিয়ে তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের কূটনীতিককে (চার্জ ডি’অ্যাফেয়ার্স) তলব করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাসের সঙ্গে ফোনালাপে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এর দৃঢ় প্রতিক্রিয়া এবং বিচার দাবি করেছেন তিনি।

তেহরান জানিয়েছে, তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে ইরান জোর দিয়ে বলেছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তারা কখনোই সরাসরি অংশ নেয়নি।

ইউক্রেনের বক্তব্য ও জেলেনস্কির অভিযোগ

অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কাস্পিয়ান সাগরে দূরপাল্লার সফল হামলার কথা স্বীকার করেছেন। তার দাবি, ওই হামলায় ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামরিক মালামাল বহনকারী জাহাজ এবং একটি রুশ যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

তবে শুধু হামলা চালিয়েই ক্ষান্ত হননি ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট; তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানকে সহায়তার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। জেলেনস্কির দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ওপর স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ইরানকে সহায়তা করছে রাশিয়া।

সংকুচিত হচ্ছে ইরানের বাণিজ্যিক করিডোর

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা ইরানের জন্য এক নতুন কৌশলগত বিপদ ডেকে এনেছে। ইতোমধ্যেই দক্ষিণে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ অবরোধ এবং লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুতিদের কার্যক্রমে ইরানের সমুদ্রপথে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে উত্তর প্রান্তে কাস্পিয়ান সাগর ঝুঁকির মুখে পড়ায় ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সরবরাহ রুটগুলো মারাত্মকভাবে সংকুচিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন সরবরাহের অভিযোগ ওঠার পর থেকেই তেহরান ও কিয়েভের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেন উপসাগরীয় দেশগুলোকে ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা দেওয়ায় সংঘাতের পরিধি এখন দুই অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে বহুগুণে বিস্তৃত হচ্ছে।

কূটনৈতিক তৎপরতা ও যুদ্ধবিরতির চেষ্টা এমন এক উত্তপ্ত সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত সাময়িক বিরতিতে রয়েছে, তখন কাস্পিয়ান সাগরের এই ঘটনা নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কাতার, মিসর ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কাস্পিয়ান সাগরে ইউক্রেনের এই হামলা তেহরানের ওপর অতিরিক্ত ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল হতে পারে, যা ভবিষ্যৎ যেকোনো কূটনৈতিক দরকষাকষিতে ইউক্রেন বা পশ্চিমা বিশ্বকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। সার্বিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

জেএস