৯০ শতাংশ কাজ শেষে ধরা পড়ল নকশার ত্রুটি৬ বছরেও সেতুতে হয়নি সংযোগ সড়ক, পার হতে হয় ঝুঁকি নিয়ে

ছবি: প্রতিনিধি
পটুয়াখালীর দশমিনায় প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতুর মূল অবকাঠামোর ৯০ শতাংশ কাজ শেষের পর ধরা পড়েছে মারাত্মক নকশাগত ত্রুটি। এর ফলে সংযোগ সড়ক নির্মাণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেটে গেছে প্রায় দীর্ঘ ছয় বছর। সংযোগ সড়ক না থাকায় দশমিনা ও বাউফল উপজেলার সীমান্তবর্তী বাঁশবাড়িয়া-বগী খালের ওপর নির্মিত সেতুটি বর্তমানে জনসাধারণের কোনো কাজেই আসছে না। বাধ্য হয়ে এলাকার সাধারণ মানুষ ইটের ব্লক দিয়ে তৈরি অস্থায়ী সিঁড়ি বেয়ে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেতু পারাপার করছেন।
প্রকল্পের পটভূমি ও অনিয়মের শুরু
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে দশমিনা ও বাউফল উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে বাঁশবাড়িয়া-বগী খালের ওপর ২৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭ মিটার প্রস্থের একটি আরসিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ কোটি ৮২ লাখ ১০ হাজার ৫০৬ টাকা।
দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পায় পটুয়াখালীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আবুল কালাম আজাদ এন্টারপ্রাইজ’। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের শেষ দিকে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সেতুর মূল অবকাঠামোর কাজ সম্পন্ন করলেও, সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে গিয়েই মূলত নকশার গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়ে। এরপর থেকেই দীর্ঘ ছয় বছর ধরে কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার ও চরম জনদুর্ভোগ
সরেজমিনে দেখা গেছে, বগী বাজারের দক্ষিণ প্রান্তে বাঁশবাড়িয়া-বগী খালের ওপর সেতুটি দাঁড়িয়ে থাকলেও দুইপাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় সেটি পুরোপুরি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে আছে। মাটি থেকে প্রায় ২০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই সেতুটিতে উঠতে স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে ইটের ব্লক সাজিয়ে অস্থায়ী সিঁড়ি তৈরি করেছেন। সেই ঝুঁকিপূর্ণ সিঁড়ি বেয়েই প্রতিদিন নারী, শিশু, শিক্ষার্থী ও বৃদ্ধসহ হাজারো মানুষ পারাপার হচ্ছেন। এর ফলে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।
সেতুটি ব্যবহার করতে না পারায় স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কৃষক সগীর মিয়া জানান, কালাইয়া দক্ষিণের বড় বাজারে ধান, চাল, ডাল ও গবাদিপশু নিয়ে যাওয়ার জন্য সেতুটি ব্যবহার করতে না পারায় তাদের অতিরিক্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।
এ ছাড়া কর্পূরকাঠি ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি ঘোষ বলেন, এলাকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদ্রাসার শত শত শিক্ষার্থী প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে ইটের তৈরি অস্থায়ী সিঁড়ি দিয়ে চলাচল করছে। এতে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই আহত হচ্ছে এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিতি দিন দিন কমে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থানীয় জনসাধারণের মতামত না নিয়ে অপরিকল্পিতভাবে নকশা করার কারণেই আজ এই দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে দশমিনা উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. মকবুল হোসেন বলেন, "আমি এই কর্মস্থলে যোগদানের আগেই মূল সেতুর নকশা ও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণের সময় ত্রুটি ধরা পড়লে কাজ স্থগিত রাখা হয়। তবে ইতোমধ্যে নতুন নকশা প্রণয়ন ও অনুমোদন সম্পন্ন হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হলেই দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।"
দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধা জানিয়েছেন, সংযোগ সড়ক না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে এলজিইডির সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে টেন্ডার সম্পন্ন করে কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন।
জেএস

মোঃ আবু বক্কার সিদ্দিক, দশমিনা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
© 2026 দৈনিক ডেসটিনি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।









