যৌতুক ও নির্যাতনের অভিযোগে ভেঙে গেল দাম্পত্য: ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় তরুণী

ছবি: ডেসটিনি প্রতিনিধি
নওগাঁর মান্দা উপজেলায় যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক হয়রানির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন এক গৃহবধূ। ভুক্তভোগী মোছা. দিলরুবা আক্তার (২২) অভিযোগ করেন, সংসার টিকিয়ে রাখতে একাধিকবার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তালাকের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। বর্তমানে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করছেন।
রোববার (১৯ জুলাই) উপজেলার গণেশপুর ইউনিয়নের গণেশপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দেন দিলরুবা।
তিনি জানান, ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর উপজেলার মধ্য মৈনম গ্রামের মাহবুল হাসান সুমনের সঙ্গে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী তার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় নগদ এক লাখ টাকা, একটি স্বর্ণের আংটি এবং আসবাবপত্র দেওয়া হলেও পরে আরও পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয়। দাবি পূরণ না করায় তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দিলরুবা জানান, বিষয়টি নিয়ে সাভার সেনানিবাসে অভিযোগ করার পর সেনা কর্মকর্তাদের উদ্যোগে চলতি বছরের ১৩ মার্চ দুই লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করে বিয়ের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়। তবে এরপরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি বলে দাবি তার।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও অভিযোগ করেন, গত বছরের ১৪ আগস্ট রাতে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয়। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে মান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
ঘটনার পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করা হলে তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে মুক্তি পান।
দিলরুবা বলেন, আদালতের মধ্যস্থতায় গত ২৯ এপ্রিল আবার স্বামীর সংসারে ফিরে যান। কিন্তু কিছুদিন পর আবারও নির্যাতনের শিকার হয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে বাধ্য হন। এরপর ২ জুন কাজী অফিসের মাধ্যমে তার কাছে তালাকের নোটিশ পাঠানো হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, তার স্বামী একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং আদালতের শর্ত লঙ্ঘন করায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত হয়ে দিলরুবা বলেন, "আমি সংসার ভাঙতে চাইনি। অনেক নির্যাতন সহ্য করেছি শুধু সংসারটা টিকিয়ে রাখার জন্য। এখন আমার একটাই দাবি—ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার।"
তিনি জানান, প্রতিকার চেয়ে খাগড়াছড়ি সেনানিবাসের অধিনায়কের কাছেও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও সেনাবাহিনী প্রধানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে তার বাবা দেলোয়ার হোসেন, মা নার্গিস বেগম, দাদা আজিজার রহমানসহ পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
অভিযুক্ত সেনাসদস্য মাহবুল হাসান সুমন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো মিথ্যা ও হয়রানিমূলক। তিনি বর্তমানে আদালত থেকে স্থায়ী জামিনে রয়েছেন। পরকীয়ার অভিযোগও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।
সুমন বলেন, তিনি আদালতে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা মোহরানার অর্থ জমা দিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় তালাক সম্পন্ন করেছেন। এরপরও বাদীপক্ষ মামলা প্রত্যাহার করে পুনরায় সংসার করার প্রস্তাব দিলেও তিনি তাতে রাজি নন। এ ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে তিনি মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন।
দিলরুবা আক্তারের অভিযোগ এবং মাহবুল হাসান সুমনের বক্তব্য—দুই পক্ষের অবস্থানই বর্তমানে বিচারাধীন বিষয়ের অংশ। অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্ত ও আদালতের রায়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। তবে ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে এবং ভুক্তভোগী দিলরুবা এখনও একটিই দাবি জানিয়ে আসছেন—"আমি শুধু ন্যায়বিচার চাই।"
ইউ

শহিদুল ইসলাম, নওগাঁ প্রতিনিধি
© 2026 দৈনিক ডেসটিনি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।










