৪৮ দলের অংশগ্রহণে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হলো নানা নাটকীয়তা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই মেগা ইভেন্টটি মাঠের ফুটবলে যেমন উপহার দিয়েছে রূপকথা, তেমনি মাঠের বাইরের রাজনীতি ও বাণিজ্যের কারণেও ছিল আলোচনায়।

নতুন দলগুলোর উত্থান

বিশ্বকাপের পরিধি বাড়ানো নিয়ে শুরুতে ফুটবল বোদ্ধাদের মধ্যে দ্বিধা থাকলেও, মাঠের লড়াইয়ে তা ভুল প্রমাণ করেছে ছোট দলগুলো। বিশেষ করে কেপ ভার্দের মতো ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রের সাফল্য ছিল আসরের অন্যতম সেরা গল্প। স্পেন ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলকে রুখে দিয়ে নকআউট পর্বে ওঠা এবং আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লড়াই করা ফুটবল প্রেমীদের দীর্ঘ সময় মনে থাকবে। এছাড়াও কুরাসাও ও জর্ডানের মতো দলের পারফরম্যান্স টুর্নামেন্টকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

বিজ্ঞাপনের হাতিয়ারে পরিণত ‘হাইড্রেশন ব্রেক’

খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের কথা বলে চালু করা বাধ্যতামূলক ৩ মিনিটের ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আটলান্টা বা ড্যালাসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামেও এই নিয়ম মানা হয়েছে মূলত সম্প্রচারকারী চ্যানেলগুলোর সুবিধার কথা মাথায় রেখে। এসব বিরতিতে বিজ্ঞাপন স্লট থেকে মিলিয়ন ডলার আয় করেছে ফক্স স্পোর্টসের মতো চ্যানেলগুলো। তবে কোচেরা এই সময়কে কৌশলগত টাইমআউট হিসেবে ব্যবহার করে অনেক ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন।

রেফারিং ও প্রযুক্তি

পিয়েরলুইজি কলিনার তত্ত্বাবধানে ফিফার নতুন নিয়মাবলীতে খেলার গতি বেড়েছে। কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় অতিরিক্ত সময় কমিয়ে ম্যাচপ্রতি গড় স্থায়িত্ব ৯৬ মিনিটে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা সমর্থকদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। তবে নকআউট পর্বে ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে মিশরের একটি গোল বাতিল হওয়ার পর তারা তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

রাজনৈতিক বিতর্ক ও ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ

টুর্নামেন্টজুড়ে ভিসা জটিলতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিল সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানের প্রবেশাধিকার না পাওয়া এবং ইরান দলের ওপর কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা হয়েছে। তবে নজিরবিহীন বিতর্ক তৈরি হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে। ফিফা সভাপতিকে ফোন করে ট্রাম্প ফোলারিন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করিয়ে নিলে ফুটবলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

টিকিটের আকাশচুম্বী দাম ও আইনি জটিলতা

মাঠের দর্শকসংখ্যা রেকর্ড ছুঁলেও টিকিটের চড়া দাম ছিল সাধারণ দর্শকদের জন্য ভোগান্তির কারণ। ফিফার টিকিট বিক্রি ও রিসেল প্ল্যাটফর্মের অতিরিক্ত ফি আদায়ের জেরে নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সির অ্যাটর্নি জেনারেল ফিফাকে আইনি তলব করেছেন। এছাড়া শুরুতে পানির বোতল প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ফিফাকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল।

ফাইনালের নতুন সমীকরণ

সবশেষে, ফিফার নতুন সিডিং নিয়মের কারণে টুর্নামেন্টের শীর্ষ দুই দল হিসেবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন কোনো বাধা ছাড়াই ফাইনালে মুখোমুখি হয়, যা ছিল দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত। বিতর্ক ও বাণিজ্যের নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও, মাঠের রোমাঞ্চ ও নতুন নতুন শক্তির উত্থানে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।

জেএস