বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রাতের তাপমাত্রা বাড়ছে, এর প্রভাব পড়ছে মানুষের ঘুমে। ভালো ঘুম শুধু বিশ্রামের জন্য নয়, শরীর ও মনের সামগ্রিক সুস্থতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন রাতে গড়ে ৮ ঘণ্টা ঘুম মনোযোগ, কাজের দক্ষতা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর মানুষ এখন বছরে ৭২ থেকে ৮৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুম হারাচ্ছেন। সত্তরের দশকের তুলনায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘুমের এই ক্ষতি অন্তত দ্বিগুণ বেড়েছে। গবেষকেরা বলছেন, এতে জনস্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট সেন্ট্রাল প্রকাশিত ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ইজ কস্টিং চেঞ্জ পিপলস স্লিপ’ শীর্ষক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ঢাকায় ও রাজশাহীতে তাপমাত্রাজনিত ঘুমের ক্ষতির মাত্র ৩ শতাংশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী ছিল। ২০২০ থেকে ২০২৫ সময়ে তা বেড়ে ৬ শতাংশে পৌঁছেছে, অর্থাৎ ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কুমিল্লা ও রংপুরে এই হার ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ শতাংশ হয়েছে, যা পাঁচ দশকে ১৩০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শহরগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে বছরে সবচেয়ে বেশি, ৮৪ ঘণ্টা ঘুম হারানোর তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর রয়েছে খুলনা (৭৯ ঘণ্টা), ঢাকা ও রাজশাহী (৭৬ ঘণ্টা), গাজীপুর ও কুমিল্লা (৭৪ ঘণ্টা) এবং রংপুর (৭২ ঘণ্টা)। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার চিত্রও উদ্বেগজনক। মিরপুর ও পল্লবীর বাসিন্দারা বছরে প্রায় ৭৭ ঘণ্টা এবং মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা ৭৩ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুম হারাচ্ছেন।
বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক প্রবণতারই প্রতিফলন। বিশ্বের ১ হাজার ৩৩৮টি বড় শহরে তাপমাত্রাজনিত ঘুমের ক্ষতি ১৯৭০–১৯৭৫ সময়ে জনপ্রতি বছরে ৪৫ দশমিক ৬ ঘণ্টা থেকে বেড়ে ২০২০–২০২৫ সময়ে ৪৯ দশমিক ৯ ঘণ্টায় পৌঁছেছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ঘুমের ক্ষতি আরও দ্রুত বেড়েছে। এটি ১ দশমিক ৭ ঘণ্টা থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ১ ঘণ্টায় পৌঁছেছে, অর্থাৎ প্রায় তিন গুণ। ফলে মোট ঘুমের ক্ষতির মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের অবদান ৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনটি বলছে, এটি প্রথম গবেষণা, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘুমের ক্ষতির পরিমাণ পরিমাপ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বিশ্বের ১ হাজার ৩৩৮টি শহরের মধ্যে ১ হাজার ৩৩৫টিতেই সত্তরের দশকের তুলনায় তাপমাত্রাজনিত ঘুমের ক্ষতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা অন্তত দ্বিগুণ হয়েছে।
গবেষকদের মতে, রাতে তাপমাত্রা বেশি থাকলে শরীর দিনের তাপ থেকে স্বাভাবিকভাবে সেরে উঠতে পারে না। ফলে ঘুমের সময় ও মান—দুইই কমে যায়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, কর্মক্ষমতা হ্রাসসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। দ্রুত নগরায়ণ, শহরে তাপদ্বীপ (আরবান হিট আইল্যান্ড) প্রভাব এবং শীতলীকরণ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, উষ্ণ রাতের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং নিম্ন আয়ের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। শীতলীকরণ ব্যবস্থার সীমিত সুযোগ থাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠী ঘুমের ব্যাঘাত ও এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব বেশি ভোগ করে। এমনকি যেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানেও রাতের বাড়তি তাপমাত্রা ঘুমের মান কমিয়ে দেয়।
গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্সের চেয়ারম্যান এবং কানাডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট ডা. কোর্টনি হাওয়ার্ড বলেন, ‘একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থ থাকতে প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উষ্ণ রাত বাড়তে থাকায় ঘুমের ব্যাঘাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে। তাই অভিযোজন ব্যবস্থার পাশাপাশি দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো জরুরি।’
প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় রাতের অতিরিক্ত তাপমাত্রার ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য শীতলীকরণ সুবিধা বাড়ানো, নগর পরিকল্পনায় তাপদ্বীপ প্রভাব কমানো, তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা জোরদার করা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের ঘুমবিশেষজ্ঞ ও পালমোনোলজিস্ট মেয়ার ক্রাইগার জানিয়েছেন, যথেষ্ট ঘুম না হলে মেটাবলিক সমস্যা যেমন স্থূলতা, প্রদাহ, মানসিক চাপ, রোগ প্রতিরোধে দুর্বলতা এবং রক্তনালির প্রাচীরে অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। এসব পরিবর্তন হৃদ্রোগের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে পারে।
‘ যাদের হৃদ্রোগের জেনেটিক ঝুঁকি আছে, তাঁদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায় কম ঘুম হলে। তাই ঘুমকে প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় অগ্রাধিকার দিতেই হবে,’ বলে মত তার।
ইউ