নোয়াখালী জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পানিতে ডুবে ৬৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে পানিতে পড়ে আহত হওয়া ২১৫ শিশুকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এ ধরনের দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশুদের সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা করা গেলে এসব অকাল মৃত্যু অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পানিতে ডুবে মারা যাওয়া ৬৫ শিশুর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায়। এছাড়া কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় মারা গেছে ১৪ শিশু।
এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “নোয়াখালীসহ দেশের প্রতিটি শিশুমৃত্যুই অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অভিভাবক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সচেতনতা বাড়লে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।”
বর্ষা মৌসুমে নোয়াখালীর খাল, নদী-নালা, পুকুর ও ডোবা পানিতে পূর্ণ থাকে। এ সময় পরিবারের অগোচরে কিংবা অসাবধানতার কারণে শিশুরা খেলতে গিয়ে পানিতে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ শিশুই সাঁতার না জানার কারণে জীবন হারায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সময়মতো সাঁতার শেখানো হলে এ ধরনের মৃত্যুর বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু জেলার কোথাও শিশুদের জন্য নিয়মিত সাঁতার প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় তারা ঝুঁকি নিয়েই বেড়ে উঠছে।
সোনাপুরের শ্রীপুর গ্রামের বাসিন্দা জহির উদ্দীন (৫৯) জানান, শৈশবে তিনি দুইবার পুকুরে পড়ে পথচারীদের সহায়তায় প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর ছোট বোনও একবার পানিতে পড়ে রক্ষা পান। তবে সম্প্রতি তাঁর বড় ভাই জসিম উদ্দীনের দেড় বছর বয়সী ছেলে পানিতে পড়ে মারা যায়।
অন্যদিকে, বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর এলাকার বাসিন্দা শাহমীর আল মহিউদ্দিন অনুজ দুই বছর বয়সে ঘরের পাশের পুকুরে পড়ে পানিতে ভেসে যাচ্ছিল। স্বজনরা দ্রুত দেখতে পেয়ে তাকে উদ্ধার করায় সে প্রাণে বেঁচে যায়।
গ্রাম্য চিকিৎসক আহসান উল্যা পলাশ বলেন, “সকল স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে শিশুদের সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের জন্য স্কুলভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলে তাদের মধ্যে সাঁতার শেখার আগ্রহ বাড়বে। পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকলে অভিভাবকরাও উৎসাহিত হবেন।”
নোয়াখালী সদর উপজেলার মহব্বতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজল রাণী রায় বলেন, “নোয়াখালী উপকূলীয় জেলা হওয়ায় এখানে খাল-বিল, নদী-নালার সংখ্যা বেশি। প্রতিবছর জলাবদ্ধতা ও বর্ষা মৌসুমে অনেক শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুদের সাঁতার শেখানো উচিত। সাঁতার শুধু জীবন রক্ষা করে না, এটি একটি কার্যকর শারীরিক ব্যায়ামও। পাশাপাশি বন্যা, জলাবদ্ধতা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও সাঁতার জানা শিশুদের আত্মরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
নোয়াখালী জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “প্রত্যেক জেলা ক্রীড়া সংস্থার মাধ্যমে শিশুদের জন্য নিয়মিত সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং সুইমিং পুল নির্মাণ করা হলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। নোয়াখালী জেলা ক্রীড়া সংস্থার অধীনেও এ ধরনের প্রশিক্ষণ চালু করা সময়ের দাবি।”
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের সার্বক্ষণিক তদারকি, বাড়ির আশপাশের জলাশয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাঁতার প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁদের মতে, সম্মিলিত উদ্যোগই পারে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনা কমিয়ে আনতে।
ইউ