ফুটবল মাঠে হলুদ ও লাল কার্ডের প্রবর্তনের নেপথ্যে যে আর্জেন্টাইন ফুটবলারের প্রতিবাদের ইতিহাস জড়িয়ে আছে, সেই কিংবদন্তি আন্তোনিও রাত্তিন আর নেই। ৮৯ বছর বয়সে বুয়েন্স আয়ার্সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন বোকা জুনিয়র্স ও আর্জেন্টিনার ইতিহাসের এই অবিসংবাদিত নায়ক। আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) তার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে।

হলুদ ও লাল কার্ডের জন্মকথা

১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে রেফারি রাত্তিনকে ‘মৌখিক অসদাচরণের’ অভিযোগে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন। তৎকালীন ফুটবলে হলুদ বা লাল কার্ডের প্রচলন ছিল না, ফলে খেলোয়াড়রা রেফারির ভাষা বুঝতে প্রায়ই বিভ্রান্ত হতেন।

মাঠ ছাড়ার সময় রাত্তিন রাগে কর্নার ফ্ল্যাগ মুচড়ে ফেলেন এবং রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্য সংরক্ষিত লাল কার্পেটের ওপর বসে পড়েন। তার এই চরম প্রতিবাদী আচরণ বিশ্ব ফুটবলে শোরগোল ফেলে দেয়। এই ঘটনার পরই ফিফার তৎকালীন রেফারিং কমিটির প্রধান কেনেথ জর্জ অ্যাস্টন ট্রাফিক সিগন্যালের আদলে ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন, যা আজও খেলার মাঠে শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রধান হাতিয়ার।

এক ক্লাবের অনুগত সৈনিক

রাত্তিন ছিলেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার পজিশনের খেলোয়াড়। শক্তিশালী ট্যাকল ও শারীরিক সক্ষমতার জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘ ১৪ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি শুধু একটিই জার্সি গায়ে জড়িয়েছিলেন—বোকা জুনিয়র্স। এই ক্লাবের হয়ে জিতেছেন ছয়টি লিগ শিরোপা। তাকে বোকা জুনিয়র্সের চিরকালীন ‘আইকন’ বা প্রতীক মানা হয়। আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি খেলেছেন ১৯৬২ ও ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে।

ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা বৈরিতার শুরু

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ওয়েম্বলিতে রাত্তিনের সেই প্রতিবাদী আচরণই ছিল ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের ফুটবল বৈরিতার বীজ। এই বৈরিতার সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় রচিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালে, যখন ম্যারাডোনার ‘ঈশ্বরের হাত’ ও ‘শতাব্দীর সেরা গোলের’ মাধ্যমে আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে স্তব্ধ করে দেয়।

এক কাকতালীয় বিদায়

সবচেয়ে নাটকীয় বিষয় হলো, ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আগামী বুধবার দিবাগত রাতে আটলান্টায় আবারও মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। এই ঐতিহাসিক ম্যাচের দু’দিন আগেই না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন সেই ফুটবলার, যার হাত ধরেই দুই দেশের মধ্যে মাঠের লড়াইয়ে উত্তেজনার জন্ম হয়েছিল।

ফুটবল বিশ্ব আজ শোকাতুর এমন একজন নেতার বিদায়ে, যিনি মাঠের প্রতিবাদে বদলে দিয়েছিলেন খেলার নিয়মকানুন। তার প্রয়াণে শোক প্রকাশ করে বোকা জুনিয়র্স বলেছে, “তিনি শুধু আমাদের নেতা ছিলেন না, ছিলেন আর্জেন্টিনার ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ।”

জেএস