ঢাকায় পানিবদ্ধতা/৪১ স্লুইসগেটের ২২টিই অচল, নাকাল নগরবাসী

ছবি: সংগৃহীত
টানা দুই দিনের অতি বর্ষণে তলিয়ে গেছে রাজধানী ঢাকা। ১৯২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে নগরীর নীলক্ষেত, জিগাতলা, মতিঝিল, মিরপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল অতিবৃষ্টি নয়, রাজধানীর এই ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মূল কারণ পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোর চরম অকার্যকারিতা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাব।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা গেছে, নগরীর পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম ৪১টি স্লুইসগেটের মধ্যে মাত্র ১৯টি সচল। বাকি ২২টির মধ্যে ছয়টি সম্পূর্ণ অকেজো এবং ১৫টি আংশিক সচল হলেও পানি প্রবাহে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পাম্পস্টেশনগুলোর যন্ত্রপাতিও দীর্ঘদিন ধরে বিকল। টিটিপাড়া পাম্পস্টেশনের তিনটি বড় পাম্পের মধ্যে একটি দেড় বছর ধরে নষ্ট। এছাড়া ড্রেন পরিষ্কারের জন্য পর্যাপ্ত সাকার মেশিন না থাকায় বর্জ্যে পানি নিষ্কাশন পথগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে।
আড়াই কোটি মানুষের এই মেগাসিটি মাত্র আটটি আউটলেটের ওপর নির্ভরশীল, যা বর্তমান সময়ের বৃষ্টিপাতের চাপের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কয়েক দশক আগের তৈরি ড্রেনেজ ব্যবস্থা বর্তমানে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকার পানি নদী পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই ড্রেন ও বক্স কালভার্টে আটকে যাচ্ছে। বিশেষ করে নীলক্ষেত-জিগাতলা এলাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে দুটি ড্রেন স্থায়ীভাবে বন্ধ থাকায় ওই অঞ্চলে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে একদিনে ২৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাতের ঘটনা আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হয়নি। এছাড়া নগরীর জলাভূমি ও সবুজ এলাকা ৯০ শতাংশ কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশের পথও রুদ্ধ হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, "ঢাকা শহরকে কেবল পাম্প-নির্ভর করে বাঁচানো সম্ভব নয়। আমাদের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো দখল হয়ে গেছে এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার চরম অভাব রয়েছে। সিটি করপোরেশনে দক্ষ জনবলের সংকট এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে স্থায়ী সমাধান সম্ভব হচ্ছে না।"
ডিএসসিসির প্রকৌশলী রাজিব খাদেম জানিয়েছেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং অকার্যকর স্লুইসগেট মেরামতের জন্য ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) মাধ্যমে সমীক্ষা চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে, ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান দাবি করেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও পাম্পগুলো সচল রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অবকাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করলে ঢাকাবাসীকে প্রতি বর্ষায় এমন ‘জলজট’ আর ভোগান্তির শিকার হতেই হবে।
জেএস

ডেসটিনি প্রতিবেদক
© 2026 দৈনিক ডেসটিনি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।










