রাস্তার পাশের ফুটপাতে পাটের বস্তা বিছিয়ে একটি ছোট বাক্স নিয়ে প্রতিদিন বসেন সত্তরোর্ধ্ব আনন্দ দাস। পাশে থাকে সুই-সুতা, চিমটা, নেহাই, কাঠের তক্তা, চামড়া, সুতা ও চামড়া কাটার বিভিন্ন সরঞ্জাম, সঙ্গে জুতা পালিশের কালি। এই সামান্য উপকরণই তাঁর জীবিকার অবলম্বন।

দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে জুতা সেলাই ও মেরামতের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাদারীপুরের রাজৈর পৌর শহরের উপজেলা চত্বর, রাজৈর বাজার ও থানা মোড় এলাকায় চলে তাঁর কর্মব্যস্ততা।

বয়সের ভারে দাঁড়াতে ও হাঁটতে কষ্ট হলেও জীবনসংগ্রামে থেমে যাননি আনন্দ দাস। অভাব-অনটনের মধ্যেও পরিবার নিয়ে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আনন্দ দাস মাদারীপুর সদর উপজেলার কুনিয়া ইউনিয়নের মৃত সতীশ দাসের ছেলে। বার্ধক্য তাঁকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে দিলেও কর্মস্পৃহা এখনও অটুট।

আনন্দ দাস জানান, তাঁদের বাপ-দাদারাও একই পেশায় ছিলেন। মাত্র ২০ বছর বয়স থেকে তিনি বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে জুতা ও স্যান্ডেল সেলাইয়ের কাজ করছেন। এই পেশার আয় দিয়েই এতদিন সংসার চালিয়েছেন এবং তিন মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন।

তিনি বলেন, "আগের মতো এখন আর মানুষ ছেঁড়া জুতা সেলাই করাতে আসে না। অনেকেই নতুন জুতা কিনে নেয়। অথচ কাজের খরচ বেড়েই চলেছে। আগে যে কালি ৪০ টাকায় কিনতাম, এখন সেটি ১২০ টাকা দিতে হয়। কিন্তু সেই তুলনায় মজুরি বাড়েনি। প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। এই আয়ে সংসার চালানো এবং বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগের ওষুধ কেনা খুবই কঠিন।"

অভাবের মধ্যেও কারও কাছে সাহায্যের হাত না পেতে নিজের পরিশ্রমের ওপরই ভরসা রেখেছেন তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করেই সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে চান বলে জানান আনন্দ দাস।

জুতা পালিশ করাতে আসা এক ব্যাংক কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, "আনন্দ দাস আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা। বার্ধক্যের ভারেও তিনি পরিশ্রম করে নিজের সংসার চালাচ্ছেন। এটি সত্যিই বিরল এবং সম্মানজনক একটি দৃষ্টান্ত।"

দীর্ঘ পাঁচ দশকের শ্রম, আত্মসম্মান ও অধ্যবসায়ের প্রতীক আনন্দ দাস। জীবনের প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে কর্মের মধ্য দিয়েই তিনি এগিয়ে চলেছেন। তাঁর সংগ্রামী জীবন সমাজের অনেক মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

ইউ