টানা সাত দিনের ভারী বর্ষণ, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কক্সবাজার জেলা। গত ৫ জুলাই থেকে ১০ জুলাই—এই ছয় দিনে জেলায় পানিতে ডুবে ও পাহাড়ধসে শিশুসহ মোট ২৬ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে জেলার প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় অত্যন্ত দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।
নিহতের ঘটনা ও সর্বশেষ পরিস্থিতি
সর্বশেষ শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবির ঘটনায় হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) চকরিয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে মোহাম্মদ ওয়াকিম (২) ও পুষ্প (৩) নামের দুই শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিন ভোরে পাহাড়ধসে চকরিয়ার মছনিয়া কাটা এলাকায় এক পরিবারের দুই শিশু মাটি চাপা পড়ে প্রাণ হারায়। এছাড়া জেলা সদর, পেকুয়া ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ২১ জন বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

প্লাবিত এলাকা ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, কক্সবাজারের ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম এখন পানির নিচে। এর মধ্যে চকরিয়া, পেকুয়া ও নতুন গঠিত মাতামুহুরী উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম জানান, বান্দরবান থেকে নেমে আসা পানির কারণে মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে চকরিয়া ও পেকুয়ার বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে।
ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা
চকরিয়া ও মাতামুহুরীর ইউএনও শাহীন দেলোয়ার জানান, ওই দুই উপজেলাতেই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। বর্তমানে ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গতদের শুকনো খাবার ও জরুরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাঁধ মেরামত ও পানি নিষ্কাশনের জন্য স্লুইস গেটগুলো সচল রাখতে প্রশাসন সার্বক্ষণিক তদারকি করছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সরকারি হিসাবে জেলায় ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১৪ হাজার মানুষ ঠাঁই নিয়েছেন। ত্রাণ সহায়তার অংশ হিসেবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কতা
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানান, গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে, যা বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সতর্কতার অংশ হিসেবে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে।
কক্সবাজারের এই ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
জেএস