দেশ সেরা প্রতিষ্ঠানের পুরষ্কার পেলো নোয়াখালীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র

ছবি: ডেসটিনি প্রতিনিধি
প্রসূতি ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবায় অনন্য দৃষ্টান্তের কারনে নোয়াখালীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি সারাদেশের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে গুলির মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসাবে নির্বাচিত হয়েছে।
নোয়াখালীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে গত ছয় মাসে নিরাপদ প্রসবসেবা দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ২৯৭ জন নারীকে। যার মধ্যে ১ হাজার ৭৪ জন মায়ের নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। অর্থাৎ ৯৮ শতাংশের বেশি নরমাল ডেলিভারি হয়েছে।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষ্যে গত ১২ জুলাই রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে এর পুরস্কার হিসেবে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদপত্র গ্রহণ করেছেন নোয়াখালী মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) মুহাম্মদ জিহাদুল হক।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, “২০১৬ সালে এই প্রতিষ্ঠানে প্রসব সংখ্যা ছিল শুন্য। সেই প্রতিষ্ঠান আজকে জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষে অবস্থান করছে। আজকের এ সফলতা আমার একার নয়। এখানে কর্মরত ছোট বড় সকলের সমন্বিত চেষ্টা ও আন্তরিক সহযোগীতা ও পরিশ্রমের ফসল। তিনি এ অর্জনের জন্য সকলরে প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।”
খোজঁ নিয়ে জান গেছে, ২০০৫ সালের ১৭ এপ্রিল নোয়াখালী মাইজদীর ল’ইয়ার্স কলোনী এলাকায় মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে নানা সংকটে প্রত্যাশিত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়ে ২০১৬ সালে প্রসবসেবা শূন্যের কোটায় নেমে যায়।
২০২১ সালে চিকিৎসক মুহাম্মদ জিহাদুল হক প্রতিষ্ঠানটিতে মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) হিসেবে দায়িত্ব পান। তিনি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বরত সবাইকে নিয়ে ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ প্রসবসেবা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।বিদ্যমান সংকটগুলো একে একে তারা নিজেদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং স্থানীয়দের সহায়তায় সমাধান করেন। দিনদিন সেবাগ্রহীতাদের আস্থা বাড়তে থাকে এবং এ প্রতিষ্ঠানের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।প্রতি মাসে দুই শতাধিক নরমাল ডেলিভারি হয়।এছাড়া প্রসবপূর্ব, প্রসবকালীন এবং প্রসবপরবর্তী সব ধরনের সেবা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা এবং শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন সেবা দেওয়া হয় এখানে।
প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ছয়জন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন ল্যাব টেকনোলজিস্ট, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন মিডওয়াইফ, একজন অ্যাম্বুলেন্স চালক ও পাঁচজন আয়া রয়েছেন।
কর্মরতদের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার ফলে ২০২৫ সালে নোয়াখালীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ডেলিভারি হয়েছে ২ হাজার ৭০৪টি। এর মধ্যে সিজার হয়েছে মাত্র ৯৬টি।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ১ হাজার ২৭৪টি নরমাল ডেলিভারি এবং ২৩টি সিরাজ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির মেডিকেল অফিসার জিহাদুল হক বলেন, “আমরা চেষ্টা করেছি মায়েদের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে।এখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সকল সেবা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্ট করেছি। আমাদের ল্যাব ফ্যাসিলিটি রয়েছে, আলটাসোনোগ্রাম ফ্যাসিলিটি রয়েছে। সেগুলো আমরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়ার চেষ্টা করছি।যাবতীয় সেবা বিনামূল্যে রাখার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষজন এখানে আসছেন এবং তাদের আত্মীয় স্বজনদের উৎসাহিত করছেন। তারই ফলশ্রুতিতে আজকের এই অর্জন।”
এই কেন্দ্রে একজন সার্বক্ষণিক গাইনী বিশেষজ্ঞ থাকলে সেবার মান আরো কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এছাড়া একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ না থাকায় রোগী আনা নেওয়া যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত ঔষধ সরবরাহ না থাকায় হিমশিম খেতে হয়, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
নোয়াখালীর পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপ-পরিচালক আবুল কাশেম মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, “সরকারের একটা কর্মসূচি আছে‘ জিরো হোম ডেলিভারি’।স্বাবাভিক প্রসবসেবাটা প্রতিষ্ঠানে করানো। আর্থিক সক্ষমতা না থাকার কারণে তারা সেবাকেন্দ্রে আসতে অনীহা বোধ করে।ফলে অদক্ষ ধাত্রী দ্বারা বাড়িতে প্রসবসেবা করে থাকে। এতে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু দুইটারই ঝুঁকি থাকে। এখানে সেই দরিদ্র মানুষজনই বিনামূল্যে সেবা পেয়ে থাকেন।”
এখানে যারা সেবা নিতে আসেন বেশিরভাগই দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উল্লেখ করে তিনি বলেন, “একজন দরিদ্র মা যখন এখান থেকে বিনামূল্যে ভালো সেবাটা পান তখন তিনি আরো পাঁচজন মাকে বলেন। এভাবেই এখানকার সেবার মানটা বৃদ্ধি পাচ্ছে”।
“এছাড়া এখানে চিকিৎসকসহ যে টিমটা আছে, তারা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিবেদিত । প্রত্যেক মা এখানে সেবা নিতে এসে, সেবা পেয়ে খুশি হন।”
তিনি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে এ সেবাকেন্দ্রটির প্রথম হয়েছে এটা অবশ্যই আমাদের জন্য গর্বের এবং এ অর্জন আমাদের এই অগ্রযাত্রাকে আরো উৎসাহিত করবে, আমাদের এই সেবা কার্যক্রমের সাথে যারা জড়িত তাদেরকেও কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে।”
এছাড়া এই কেন্দ্রের বর্তমান সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এমনটাই প্রত্যাশা করি।
জেএস

গোলাম মহিউদ্দিন নসু, বিশেষ প্রতিনিধি(নোয়াখালী)
© 2026 Daily Destiny. All rights reserved.






