বিশ্বজুড়ে চরম বৈরী আবহাওয়া ও ধ্বংসলীলা চালাতে সক্ষম ‘সুপার এল নিনো’র ঝুঁকি মোকাবেলায় এক বিতর্কিত প্রযুক্তির কথা ভাবছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, কৃত্রিম উপায়ে সূর্যের আলো কিছুটা কমিয়ে সাময়িকভাবে এল নিনোর প্রভাব প্রশমিত করা সম্ভব হতে পারে। তবে এই জলবায়ু প্রকৌশল বা ‘জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং’ প্রযুক্তি ব্যবহারে রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা ও বড় ধরনের ঝুঁকির হাতছানি।
সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফির একদল গবেষক এই সম্ভাবনা যাচাই করেছেন।
গবেষণায় ‘মেরিন ক্লাউড ব্রাইটেনিং’ বা সামুদ্রিক মেঘ উজ্জ্বলকরণ প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে সমুদ্রের ওপর থাকা মেঘের স্তরে বিশেষ কণা স্প্রে করা হয়, যা সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে মহাকাশে পাঠিয়ে দেয় এবং পৃথিবীকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। ২০১৯-২০ সালের অস্ট্রেলিয়ার প্রলয়ংকরী দাবানল থেকে নির্গত ধোঁয়া প্রশান্ত মহাসাগরের মেঘের সঙ্গে মিশে একইভাবে সূর্যালোক প্রতিফলিত করে ওই অঞ্চলকে শীতল করেছিল, যা থেকে বিজ্ঞানীরা এই ধারণার সূত্রপাত করেন।
কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এল নিনো শুরু হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে তা এর ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটা দুর্বল করতে পারে।
জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রবল মতভেদ রয়েছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
অনিশ্চিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: এই প্রযুক্তির ফলে অগণিত এবং অপ্রত্যাশিত সব বিপর্যয়কর প্রভাব দেখা দিতে পারে।
টার্মিনেশন শক: প্রযুক্তিটি একবার চালু করার পর হুট করে বন্ধ করা হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা এক ধাক্কায় ভয়ংকর মাত্রায় বেড়ে যেতে পারে।
মেগা লা নিনা: অতিরিক্ত শীতলীকরণের ফলে এমন শক্তিশালী ‘লা নিনা’ তৈরি হতে পারে, যা এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় বিধ্বংসী বন্যা এবং অন্যান্য অঞ্চলে ভয়াবহ খরা ডেকে আনতে পারে।
প্রযুক্তিগত ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ: সমালোচকদের মতে, বর্তমান স্প্রেয়ারগুলোর সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অন্তত ১০০ গুণ কম। তাছাড়া, এই প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আসলে কার—তা নিয়ে বড় ধরনের নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এর ফলে কার্বন নির্গমন কমানোর মতো মূল প্রচেষ্টা থেকে বিশ্বের মনোযোগ সরে যেতে পারে।
গবেষণার অন্যতম লেখক জলবায়ু বিজ্ঞানী কেট রিক জানিয়েছেন, তারা কোনোভাবেই এটি স্থায়ীভাবে ব্যবহারের পক্ষে সুপারিশ করছেন না। তার মতে, এটি কেবল একটি সাময়িক হাতিয়ার হিসেবে এল নিনোর মতো বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে তিনি এও স্বীকার করেছেন যে, এর লাভ-ক্ষতির দিকটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিচার করতে হবে এবং আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস হেউড বলেন, “এই প্রযুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য হবে, তা জানার চেয়ে আমরা এখনও অনেক দূরে আছি।”
সব মিলিয়ে, ‘সুপার এল নিনো’র ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে মানুষ জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের এমন চরম পথ বেছে নেবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা দুটোই এখন তুঙ্গে।
জেএস