দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ প্রতি বছরই বন্যা ও নদীভাঙনের ভয়াবহতার মুখোমুখি হয়। আকস্মিক বন্যার স্রোত কিংবা নদীগর্ভে বসতভিটা বিলীন হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক নিয়ে হাজারো পরিবারকে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব, বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং গবাদিপশু রক্ষার অনিশ্চয়তা দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকার মানুষের নিত্যসঙ্গী ছিল।
তবে সেই বাস্তবতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বাস্তবায়নাধীন ‘বন্যা প্রবণ ও নদী ভাঙ্গন এলাকায় বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ(৩য় পর্যায়)’ প্রকল্প।
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরবর্তী একটি চরাঞ্চলের বাসিন্দা রাহিমা বেগম। ২০২৫ সালের বন্যার সময় স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় তার পরিবার সেখানকার নবনির্মিত তিনতলা বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। আশ্রয়কেন্দ্রের নিচতলায় প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত জায়গা থাকায় তার শাশুড়ি নিরাপদে আশ্রয় পান।
নারী ও শিশুদের জন্য পৃথক কক্ষ ও বাথরুম থাকায় রাহিমা বেগম সন্তানদের নিয়ে স্বস্তিতে অবস্থান করেন। এছাড়া গভীর নলকূপের বিশুদ্ধ পানি, ২০০০ ওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ এবং নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে দেয়। পরিবারের দুটি গরুও আশ্রয়কেন্দ্রের নির্ধারিত স্থানে নিরাপদে রাখা সম্ভব হয়, ফলে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রক্ষা পায়।
রাহিমা বেগম বলেন, ‘আগে বন্যার সময় অসুস্থ শাশুড়ি আর ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাতাম। এবার আশ্রয়কেন্দ্রে এসে নিরাপদ পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানি ও আলাদা সুবিধা পেয়ে অনেক স্বস্তি পেয়েছি। মনে হয়েছে আমরা একা নই।’
২০২৬ সালে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে আবদুল করিম পরিবারসহ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পান। স্বাভাবিক সময়ে কেন্দ্রটি শিশুদের অতিরিক্ত পাঠদানসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় পুরো এলাকাই উপকৃত হচ্ছে। তাঁর মতে, “আশ্রয়কেন্দ্রটি শুধু দুর্যোগ নয়, সারা বছরই আমাদের বড় ভরসা।”
যমুনা নদীর ভাঙনপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারী সিরাজগঞ্জ জেলার আবদুল করিম। ওই জেলার গাংচিল গ্রামে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করছেন। অতীতে আকস্মিক বন্যা বা নদীভাঙনের সময় পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। এলাকায় শক্তপোক্ত কোনো আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় মানুষকে বিভিন্ন অস্থায়ী স্থানে আশ্রয় নিতে হতো।
২০২৬ সালের জুন মাসে নদীভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিলে আবদুল করিম পরিবারসহ নতুন বহুমুখী বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেন। সেখানে তারা নিরাপদ পরিবেশের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাসেবা, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা পান। আশ্রয়কেন্দ্রে গবাদিপশু রাখার সুবিধা থাকায় তাঁদের কৃষিকাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদও নিরাপদ থাকে। দুর্যোগকালীন এই সহায়তা তাঁদের আর্থিক ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনে।
আবদুল করিম বলেন, ‘এই আশ্রয়কেন্দ্র আমাদের শুধু দুর্যোগের সময় রক্ষা করে না, সারা বছরই নানা কাজে উপকার করে। বাচ্চাদের পড়াশোনা, মানুষের সভা কিংবা জরুরি আশ্রয়Íসবকিছুর জন্যই এটি আমাদের বড় ভরসা।’
কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের রাহিমা বেগম কিংবা সিরাজগঞ্জের যমুনাপাড়ের আবদুল করিমের মতো অসংখ্য মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, এসব আশ্রয়কেন্দ্র এখন শুধু দুর্যোগকালের নিরাপদ ঠিকানা নয়; বরং শিক্ষা, সামাজিক কর্মকাণ্ড, কমিউনিটি উন্নয়ন এবং স্থানীয় মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
প্রকল্পটি দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন ও মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুর্যোগের সময় ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও গবাদিপশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করছে ‘বন্যা প্রবণ ও নদী ভাঙ্গন এলাকায় বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ (৩য় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্প।
২০১৮ সালে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে (জিওবি) ১ হাজার ৫ শত ৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ হবে ২০২৭ সালে । এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য দেশের বন্যা ও নদী ভাঙ্গনপ্রবণ ৪৩টি জেলার ২৫৮টি উপজেলায় মোট ৪৪৮টি বহুমুখী বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক(ডিজি) রেজওয়ানুর রহমান বলেন, ‘বন্যা ও নদীভাঙন প্রবণ এলাকার মানুষের জীবন, সম্পদ ও জীবিকা সুরক্ষায় সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বহুমুখী বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করছে।
এসব আশ্রয়কেন্দ্র শুধু দুর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করবে না; বরং স্বাভাবিক সময়েও শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, সামাজিক কার্যক্রম এবং কমিউনিটি উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর নকশা প্রণয়নের সময় নারী, শিশু, প্রবীণ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রয়োজনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গবাদিপশু রাখার পৃথক ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির জন্য গভীর নলকূপ, সৌরবিদ্যুৎ, নিরাপদ স্যানিটেশন এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার সুবিধা সংযোজন করা হয়েছে, যাতে দুর্যোগকালেও মানুষ মর্যাদার সঙ্গে নিরাপদ পরিবেশে অবস্থান করতে পারে।’
মহাপরিচালক জানান, ‘প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে দেশের বন্যা ও নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চলে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।’
*প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ও সুবিধা:
প্রকল্পটির প্রধান লক্ষ্য হলো দুর্যোগকালে ক্ষতিগ্রস্ত ও আশ্রয়হীন মানুষের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ও জরুরি সেবার সুব্যবস্থা করা। প্রতিটি ৩ তলা বিশিষ্ট ভবনে ৪০০ জন মানুষ এবং ১০০টি গবাদিপশুর নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। সে হিসেবে পুরো প্রকল্পের আওতায় একত্রে মোট ১ লাখ ৭৯ হাজার ২০০ জন মানুষ এবং ৪৪ হাজার ৮০০টি গবাদিপশু প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিরাপদে অবস্থান করতে পারবে। দুর্যোগের জরুরি সময় ছাড়াও এসব ভবনকে স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক কাজে ব্যবহারের উপযোগী করে ডিজাইন করা হয়েছে।
*আশ্রয়কেন্দ্রের স্থাপত্য নকশা ও আধুনিক সুবিধা:
প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রের প্রতি তলার আয়তন ৩৯৬ বর্গমিটার, ভবনের মোট আয়তন ১ হাজার ১৮৮ বর্গমিটার। ভবনগুলোর নকশায় বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তি, প্রবীণ, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য নীচ তলায় ২টি বিশেষ কক্ষ ও ২টি প্রতিবন্ধী সহায়ক বাথরুম। নারী ও শিশুদের জন্য ২য় তলায় ৪টি সুনির্দিষ্ট কক্ষ ও ৫টি বাথরুম। পুরুষদের জন্য ৩য় তলায় ৪টি কক্ষ ও ৬টি বাথরুমের ব্যবস্থা আছে।
এছাড়া জরুরি ও প্রশাসনিক সেবার জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে ২টি ব্যবস্থাপনা কক্ষ, ১টি ইমারজেন্সি মেডিকেল কক্ষ, ২ টি স্টোর রুম এবং ১টি রান্না ঘরের ব্যবস্থা আছে । এছাড়াও বিদ্যুৎ ও পানির সুব্যবস্থা হিসেবে প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে ১টি করে ২ হাজার ওয়াটের সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল এবং ১টি করে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে।
*বর্তমান ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি:
২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৮৮ দশমিক ২৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। ইতিমধ্যে মোট ৪৪৮টি প্রস্তাবিত কেন্দ্রসমূহের মধ্যে ৪১২টির চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩৪০টি ভবন নির্মাণ কাজ শেষ করে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া ৭২টি ভবনের ফিনিশিং, ছাদ ঢালাই ও গাথুনীর কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। ইতিমধ্যে প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২ শত ৬৫ কোটি টাকা, যা সার্বিক বাজেট বাস্তবায়নের ৮১ দশমিক ২৫ শতাংশ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর পরিচালিত এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে নদী ভাঙ্গন ও বন্যা কবলিত এলাকার বাসিন্দাদের জীবন ও সম্পদের সার্বিক নিরাপত্তা বহুমুখী শক্তিশালী রূপ লাভ করেছে। নির্ধারিত সময়ের (জুন ২০২৭) মধ্যে অবশিষ্টাংশ কাজ সম্পন্ন হলে তা জাতীয় দুর্যোগ টেকসই ব্যবস্থাপনা নীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ইউ