বিশ্বকাপে রেফারিদের ‘কাঠখড় পোড়ানো’ গল্প

ছবি: সংগৃহীত
ফুটবল বিশ্বকাপের আকর্ষণ সাধারণত খেলোয়াড়, গোল এবং ট্রফিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। কিন্তু এই বিশাল আয়োজনকে সফল করতে যে মানুষগুলো পর্দার আড়ালে সবচেয়ে বেশি চাপ সামলান, তারা হলেন ম্যাচ অফিশিয়াল বা রেফারি। বিশ্বকাপের মাঠ মাতানোর আগে একজন রেফারিকে কতটা ত্যাগ ও কাঠখড় পোড়াতে হয়, সেই গল্প অনেকেরই অজানা।
রেকর্ড সংখ্যা ও কঠিন বাছাই প্রক্রিয়া
২০২৬ বিশ্বকাপে রেকর্ড ৪৮টি দল এবং ১০৪টি ম্যাচের জন্য ১৭০ জনের বিশাল এক দল গঠন করা হয়েছে, যাতে ৫২ জন রেফারি, ৮৮ জন সহকারী রেফারি এবং ৩০ জন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) রয়েছেন। ফিফার ৫০টি সদস্য দেশ থেকে আসা এই অফিশিয়ালদের চূড়ান্ত করতে গত তিন বছর ধরে তাদের ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্স নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সেমিনার, কঠোর ফিটনেস টেস্ট এবং অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের মতো কঠিন ধাপ পেরিয়ে তবেই মিলছে বিশ্বকাপের টিকিট।
ব্যক্তিগত জীবনের ত্যাগ ও মূল্য
একজন রেফারির জন্য বিশ্বকাপে পৌঁছানো কেবল কঠোর পরিশ্রমের বিষয় নয়, এটি পারিবারিক জীবনের বড় ধরণের বলিদানও বটে। ২০০২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের সহকারী রেফারি লেইফ লিন্ডবার্গ সিএনএন স্পোর্টসকে বলেন, “বেশিরভাগ রেফারিকেই বিবাহবিচ্ছেদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পারিবারিক জীবন বিসর্জন দেওয়া তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।”
বেশিরভাগ রেফারিকেই মূল পেশার পাশাপাশি রেফারিং চালিয়ে যেতে হয়। ইতালীয় রেফারি রেনাতো ফাভেরানি জানান, ক্রেডিট ম্যানেজারের চাকরি আর রেফারিংয়ের দ্বিমুখী চাপে তিনি পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি। এই অনিশ্চিত পেশায় বছরের পর বছর শ্রম দেওয়ার পরও বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে পৌঁছাতে পারেন মাত্র হাতেগোনা কয়েক শতাংশ অফিশিয়াল।
মানসিক ও শারীরিক চ্যালেঞ্জ
মাঠের সিদ্ধান্তগুলো মুহূর্তের মধ্যে নেওয়া হলেও এর প্রস্তুতি চলে কিক-অফের কয়েক দিন আগে থেকেই। দলের কৌশল বিশ্লেষণ, খেলোয়াড়দের বৈশিষ্ট্য বোঝা এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া—সবই তাদের রুটিনের অংশ। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে দায়িত্ব পালন করা ফাভেরানি জানান, বড় ম্যাচে দায়িত্ব পাওয়ার পর যে প্রবল মানসিক চাপ তৈরি হয়, তা সামলানোই আসল পরীক্ষা।
এছাড়া বয়সের সঙ্গে শরীরের ধকল সামলানোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। খেলোয়াড়দের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে রেফারিদের অমানুষিক শারীরিক কসরত করতে হয়, যা সাধারণ মানুষের কল্পনার অতীত।
প্রযুক্তি ও অনলাইন গালিগালাজ
বর্তমানে ভিএআর প্রযুক্তির কল্যাণে রেফারিদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন সূক্ষ্ম আতশিকাচের নিচে থাকে। সামান্য ১০ সেন্টিমিটারের ভুল সিদ্ধান্তও পুরো ক্যারিয়ারের ওপর কালিমা লেপন করতে পারে। ড্যানিয়েল কার্সিও, যিনি ‘রেফারি অ্যাব্রড’-এর প্রেসিডেন্ট, তিনি জানান, ক্ষুব্ধ ভক্তদের অনলাইন গালিগালাজ এবং ক্রমাগত অপব্যবহারের কারণে নতুন প্রজন্মের রেফারিরা এই পেশায় আসতে ভয় পাচ্ছেন।
শেষ কথা
একজন খেলোয়াড় পেনাল্টি মিস করলে তা হয়তো ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু একজন রেফারির একটি ভুল সিদ্ধান্তের দায়ভার তাকে বইতে হয় আজীবন। তিন দশকের দীর্ঘ পরিশ্রমের পর বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে দাঁড়িয়েও তারা থাকেন চরম উদ্বেগে। মাঠে ১১ বনাম ১১ জনের লড়াইয়ে বাশিঁ হাতে যারা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেন, তাদের সেই অমানুষিক পরিশ্রম এবং ত্যাগের গল্পের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্বকাপের প্রতিটি সাফল্য।
জেএস

স্পোর্টস ডেস্ক
© 2026 দৈনিক ডেসটিনি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।








