রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা

ছবি: সংগৃহীত
পদ্মা নদীর তীরে দৃশ্যমান দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কাজ ২০২৮ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ শেষ হবে। তখন এর দুটি চুল্লি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হবে। আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে একটি বিকাশমান অর্থনীতির টেকসই ভিত গড়তে এই প্রকল্পকে বাংলাদেশের একটি দূরদর্শী ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
রোববার (১২ জুলাই) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা বিশ্বজুড়ে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে। বর্তমানে এই প্রকল্পের বিশাল কুলিং টাওয়ারগুলোর সামনে স্থানীয় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় এবং সেলফি তোলার আনন্দ কেবলই বিনোদন নয়, বরং তা দেশের সক্ষমতার প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর আস্থা ও জাতীয় গর্বের বহিঃপ্রকাশ।
সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। পারস্য উপসাগর থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিয়মিত লোডশেডিং এবং কলকারখানায় উৎপাদন সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
ভারতের বেঙ্গালুরুভিত্তিক 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ'-এর জ্বালানি ও জলবায়ু কর্মসূচির প্রধান আর. শ্রীকান্ত এ প্রসঙ্গে বলেন, "সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতগুলো প্রমাণ করেছে যে, বৈশ্বিক সম্পদের সংকট উন্নত দেশগুলোর চেয়ে দরিদ্র দেশগুলোকে বেশি আঘাত করে। আর এই বাস্তবতাই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পারমাণবিক শক্তির প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করেছে।"
২.৪ গিগাবাইটের এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশকে মহামারি, যুদ্ধ এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের মতো নানামুখী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ধাক্কা সামলাতে হয়েছে। ফলে ২০২৩ সালের মূল সময়সীমা কিছুটা পিছিয়ে গেছে।
'নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড'-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাসান জানান, প্রতিকূলতা কাটিয়ে এখন প্রথম রিঅ্যাক্টরটি ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয়টি তার ঠিক এক বছর পর অর্থাৎ ২০২৮ সালে পুরোপুরি চালু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
অন্যদিকে, 'ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস'-এর প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলে আগামী ৫ থেকে ৭ বছর বাংলাদেশকে গ্রিডের বেস-লোড নিয়ে ভাবতে হবে না। এটি একদিকে যেমন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দেবে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং গ্রিড আধুনিকায়নে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে।
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল টাকার অবমূল্যায়ন। ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, মূল চুক্তিতে প্রাথমিক জ্বালানিসহ এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে স্থানীয় মুদ্রায় এর খরচ প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেড়েছে।
তবে রাশিয়ান অর্থায়নের মডেলের কারণে এই বিশাল প্রাথমিক ব্যয় বাংলাদেশের জন্য বড় বোঝা হচ্ছে না, কারণ এই ঋণ ২০ থেকে ২৫ বছরের দীর্ঘ মেয়াদে পরিশোধ করার সুবিধা রয়েছে।
জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষায় বাংলাদেশ এখন প্রথাগত বড় প্ল্যান্টের পাশাপাশি ছোট মড্যুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) স্থাপনের কথা ভাবছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, সরকার ৩০০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াটের ছোট চুল্লি স্থাপনের জন্য রোলস-রয়েস এবং চীনা নির্মাতাদের সাথে প্রাথমিক আলোচনা করছে। এগুলো নদীর তীরে দ্রুত স্থাপন করা সম্ভব এবং এগুলোতে আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত ঝুঁকিও তুলনামূলক কম।
২০১১ সালের জাপানের ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তি নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা এখন কার্বনমুক্ত জ্বালানির চাহিদা এবং এআই (AI) প্রযুক্তির প্রসারের কারণে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব, নির্ভরযোগ্য এবং নিরবচ্ছিন্ন শক্তির উৎস হিসেবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ এখন বৈশ্বিক অগ্রাধিকার।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবেশীদের পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধিও বাংলাদেশের এই আগ্রহকে ত্বরান্বিত করেছে। ভারত ২০৪৭ সালের মধ্যে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা ১০০ গিগাওয়াটে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে, যেখানে রাশিয়ার রোসাটম কুদানকুলামে চারটি বড় রিঅ্যাক্টর তৈরি করছে। একইভাবে পাকিস্তানে চীন ইতিমধ্যে ৩.৩ গিগাওয়াট ক্ষমতার ছয়টি চুল্লি সরবরাহ করেছে।
সব মিলিয়ে, নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও দীর্ঘ অপেক্ষার পর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে।

ডেসটিনি প্রতিবেদক
© 2026 দৈনিক ডেসটিনি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।











