বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
এই রায়ের ফলে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং গণভোটের বিধান পুনরায় যুক্ত হলো। আদালতের এই সিদ্ধান্তকে আইনজীবীরা দেশের ইতিহাসে একটি ‘ঐতিহাসিক রায়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রায়ের মূল বিষয়বস্তু ও পর্যবেক্ষণ
এর আগে গত বছর ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের বেশ কিছু ধারা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন। রায়ে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, “গণতন্ত্র আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। দলীয় সরকারের অধীনে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেনি এবং জনগণের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়নি, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থান।”
আদালত আরও বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জনগণের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতেই সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ।
যেসব ধারা বাতিল ও পুনর্বহাল হয়েছে-
তত্ত্বাবধায়ক সরকার: পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও মৌলিক কাঠামো ধ্বংসকারী হওয়ায় আদালত তা বাতিল করেছেন।
গণভোট: সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে গণভোটের বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত ৪৭ ধারা বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল হলো।
অন্যান্য অনুচ্ছেদ: সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে বাতিল করেছেন আদালত। তবে পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল করা হয়নি; জাতির পিতার স্বীকৃতি ও ২৬ মার্চের ভাষণের মতো বিষয়গুলো বহাল থাকবে। অবশিষ্ট বিধানগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন বা পরিবর্তন করতে পারবে।
আজকের রায় ঘোষণার সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। টানা তিন দিনের শুনানি শেষে সর্বোচ্চ আদালত এই রায় প্রদান করেন।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়েছিল, যার মাধ্যমে তৎকালীন সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। পরবর্তীতে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে আজ সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ পেল।
জেএস