সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের মহিষখলা বাজারে অবস্থিত প্রায় শতবর্ষী ঐতিহাসিক কালীমন্দিরসংলগ্ন নদীতীর রক্ষা গাইডওয়াল (প্রতিরক্ষাদেওয়াল) হেলে পড়েছে। দেওয়ালের বিভিন্ন স্থানে বড় ফাটল দেখা দেওয়ায় ঐতিহাসিক মন্দিরটি এবং মহিষখলা বাজারের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী, আদিবাসী হাজং ও বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি মহিষখলা নদী দিয়ে প্রবল স্রোতে হাওরে গিয়ে মেশে। নদীটি অগভীর হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল নামলে পানির প্রবাহ ও স্রোতের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। নদীর তীর ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে মহিষখলা বাজার এবং এর পাশেই অবস্থিত ঐতিহাসিক কালীমন্দির। দীর্ঘদিন ধরে বাজারের পশ্চিম পাশের অংশটি নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
নদীভাঙন প্রতিরোধে ২০০৯-১০ অর্থবছরে সরকারি অর্থায়নে মন্দিরসংলগ্ন নদীতীরে একটি গাইডওয়াল নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘদিন কোনো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না করায় বর্তমানে গাইডওয়ালটির বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে হেলে পড়েছে এবং বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, চলমান বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে গাইডওয়ালটি পুরোপুরি ধসে পড়লে ঐতিহাসিক কালীমন্দির, বাজারের দোকানপাটসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মহিষখলা বাজার শুধু একটি স্থানীয় বাণিজ্যকেন্দ্রই নয়, এটি সরকারের রাজস্ব আয়েরও অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এ বাজার থেকে প্রতি বছর হাটের ইজারার মাধ্যমে সরকার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আদায় করে। এছাড়া বাজারসংলগ্ন সরকারি খাসজমিতে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় দীর্ঘমেয়াদি লিজ প্রদানের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদি লিজ গ্রহণে উৎসাহিত করতে সরকারি উদ্যোগে মাইকিং করা হয়েছে। বাজারের এই ঝুঁকিপূর্ণ অংশ নদীগর্ভে বিলীন হলে একদিকে যেমন সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে, অন্যদিকে বহু ব্যবসায়ী তাদের জীবিকার উৎস হারিয়ে সর্বস্বান্ত হবেন।
অন্যদিকে, মহিষখলা কালীমন্দির শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের প্রথম শনিবার এখানে বার্ষিক কালীপূজা ও ঐতিহ্যবাহী মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার আদিবাসী হাজং ও বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। এছাড়া প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এখানে নিয়মিত পূজা-অর্চনা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
মহিষখলা বাজারের হোটেল ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, "বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা বাড়লেই নদীতীরে নির্মিত গাইডওয়ালটি আরও হেলে পড়ে। যেকোনো সময় মন্দিরসংলগ্ন নদীতীর ভেঙে ঐতিহাসিক কালীমন্দির এবং বাজারের দোকানপাট নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাই দ্রুত গাইডওয়াল পুনর্নির্মাণ ও নদীতীর সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।"
কালীমন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ হাজং বলেন, "শতবর্ষী এই কালীমন্দির আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক। পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত গাইডওয়ালটি ধসে পড়লে মন্দিরটি নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত নতুন গাইডওয়াল নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।"
বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরনবী তালুকদার বলেন, "গাইডওয়ালের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এটি ধসে পড়লে মহিষখলা বাজার ও ঐতিহাসিক কালীমন্দিরের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। তাই দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।"
এ বিষয়ে মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সঞ্জয় ঘোষ বলেন, "মহিষখলা কালীমন্দিরসংলগ্ন গাইডওয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
জেএস