ম্যারাডোনা থেকে মেসি: বাংলাদেশের নীল-সাদা উন্মাদনার গল্প

ছবি: সংগৃহীত
আর্জেন্টিনা থেকে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাংলাদেশ। ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার টানে এই দুই দেশের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন। বিশ্বকাপের সময় পুরো বাংলাদেশ যেন পরিণত হয় বুয়েনস এইরেসের কোনো এক শহরতলি কিংবা স্টেডিয়ামে। কেন এই সুদূর দেশটিকে নিয়ে বাংলাদেশিদের মনে এমন গভীর আবেগ? এর উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় ইতিহাসের পাতায়।
১৯৮৬-এর ম্যারাডোনা ম্যাজিক
বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থক গোষ্ঠীর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে। কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরী পারফরম্যান্স, তার আবেগ এবং নেতৃত্ব বিশ্বজুড়ে মানুষের মন জয় করেছিল, যার প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ওপর। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার সেই ঐতিহাসিক জয় এবং একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জয় ফুটবলকে এ দেশের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়।
সাবেক ফুটবলার ও কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, ‘ম্যারাডোনার সেই অবিশ্বাস্য ফুটবল দেখেই বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকেরা আর্জেন্টিনার ভক্তে পরিণত হন। বিশেষ করে ১৯৯০ সালের ফাইনালে হারের পর ম্যারাডোনার কান্না এ দেশের মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছিল, যা আর্জেন্টিনাকে নিয়ে স্থায়ী আবেগ তৈরি করে।’
মেসির যুগে নতুন উন্মাদনা
ম্যারাডোনার যুগের পর দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে ২০২২ সালে লিওনেল মেসির হাত ধরে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে মেসি মানেই এক স্বপ্নসারথি। কর্মব্যস্ততা বা মাঝরাতের ম্যাচ—কোনো কিছুই এই সমর্থকদের থামাতে পারে না। অনেকে এটি পেয়েছেন পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে। এমনকি খেলার প্রতি এই তীব্র ভালোবাসা এখন কূটনীতির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। ফুটবলের এই জনপ্রিয়তার সূত্র ধরেই ২০২৩ সালে দীর্ঘ ৪৫ বছর পর ঢাকায় পুনরায় নিজেদের দূতাবাস চালু করে আর্জেন্টিনা।
মাঠের লড়াই বনাম মাঠের বাইরের আবেগ
ক্রীড়া সাংবাদিক ও ভাষ্যকার শাহনূর রব্বানীর মতে, বাঙালি সব সময় একজন ‘একক নায়ক’ বা ত্রাতা পছন্দ করে। ম্যারাডোনা থেকে মেসি—এই তারকাদের ক্যারিশমা এবং শৈল্পিক খেলা সমর্থকদের এই দুই লাতিন শক্তির প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তবে এই আবেগ কেবল আনন্দের উৎস নয়, একইসঙ্গে তা এক ধরনের আক্ষেপও তৈরি করে।
আক্ষেপের জায়গা: আমাদের ফুটবল কোথায়?
আর্জেন্টিনার প্রতি হাজারো বাংলাদেশির এই অকৃত্রিম ভালোবাসার মাঝেও একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায়। শাহনূর রব্বানী আক্ষেপ করে বলেন, ‘এত ফুটবলপ্রেমী একটি দেশে কেন নিজস্ব ফুটবলের এমন দৈন্যদশা?’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবেগকে সাফল্যে রূপ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশে কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বা উন্নত একাডেমি নেই। তারা উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রার কথা তুলে ধরেন। ১৯৯৭ সালের পর ক্রিকেটে সঠিক বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার কারণে বাংলাদেশ যেমন বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে, ফুটবলেও একটি সঠিক ‘রোডম্যাপ’ থাকলে হয়তো একদিন বাংলাদেশকেও বিশ্বমঞ্চে দেখা যেত।
বিশ্বকাপ চলাকালীন রাস্তাঘাট যখন আকাশি-সাদা পতাকায় ছেয়ে যায়, তখন তা কেবল একটি দলের প্রতি সমর্থন থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে লক্ষ মানুষের এক সম্মিলিত উৎসব। তবে এই উৎসবের পাশাপাশি ফুটবল সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আর্জেন্টিনার প্রতি এই ভালোবাসা যেন কেবল ভিনদেশি দলের উদযাপনেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং তা যেন বাংলাদেশের নিজস্ব ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবেও কাজ করে।
সূত্র: আল জাজিরা
জেএস

স্পোর্টস ডেস্ক
© 2026 দৈনিক ডেসটিনি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।






