উলিপুরে তিস্তার ভাঙন বসতভিটার অর্ধেকে কাটে নির্ঘুম রাত

ছবি: প্রতিনিধি
কুড়িগ্রামের উলিপুরে তিস্তা নদীর তীব্র ভাঙনে বসতভিটার অর্ধেক জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে বাকি অর্ধেক জায়গায় পরিবার নিয়ে চরম জীবনঝুঁকি ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন হোকডাঙ্গা মাঝিপাড়া এলাকার জেলে সুশান্ত কুমারসহ আরও অনেকে। গত কয়েকদিনের ভাঙনে ওই এলাকার বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার পাশাপাশি হুমকির মুখে রয়েছে আরও ১০ থেকে ১৫টি পরিবার, একটি মসজিদ এবং বিস্তীর্ণ আবাদি জমি। এদিকে অন্যান্য ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকাও বর্তমানে ভাঙনের মুখে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ও আতঙ্কিত এসব এলাকার মানুষ বসতভিটে রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
জানা গেছে, উপজেলার বজরা, গুনাইগাছ, থেতরাই ও দলদলিয়া ইউনিয়ন তিস্তা নদী দ্বারা বেষ্টিত। এসব এলাকার ভাঙনকবলিত পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বজরা ইউনিয়ন: পশ্চিম বজরা, চর বজরা, বাঁধের মাথা, উত্তর সাদুয়া দামার হাট, খামার দামার হাট নদীর পশ্চিম পাড়, সাতালস্ক, সন্তোষ অভিরাম, কাজিরচক, টিটমা, গোড়াইপিয়ার, শেখেরটেক, পাকার মাথা ও দড়ি কিশোরপুর।
থেতরাই ইউনিয়ন: বামনপাড়া, কুমারপাড়া, ভেন্ডারপাড়া, ফকিরপাড়া, মাঝিপাড়া ইত্যাদি।
দলদলিয়া ইউনিয়ন: ঠুটাপাইকার, কর্পুরা, লাল মসজিদ, অর্জুন ও রকিদেব এলাকা।
সরকারিভাবে কিছু এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হলেও অনেক স্থানেই ভাঙন এখনো অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বজরা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বজরা, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চর বজরা, থেতরাই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝিপাড়া ও ফকিরপাড়া এবং দলদলিয়া ইউনিয়নের অর্জুন, লাল মসজিদ, ঠুটাপাইকার ও রকিদেব এলাকায় ভাঙনের মাত্রা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এসব এলাকার গত কয়েকদিনের নতুন ভাঙনে একরের পর একর আবাদি জমি, বসতবাড়ি এবং বড় বড় গাছ নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) সরেজমিনে থেতরাই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝিপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় জেলে সুশান্ত কুমারের বাড়ির ৮ শতক জমির মধ্যে ৬ শতকই গত কয়েকদিনের ভাঙনে নদীগর্ভে চলে গেছে। বাকি মাত্র দুই শতক জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ভাঙা ঘরে মা, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে তিনি এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জেলে সুশান্ত কুমার জানান, "আমার বাড়ির ৮ শতক জমির মধ্যে ৬ শতকই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বাকি অর্ধেক জমিতে পরিবার নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছি। আমি একজন সাধারণ জেলে। বাড়ির এই শেষ সম্বলটুকুও যদি নদীতে চলে যায়, তবে পরিবার নিয়ে আমি কোথায় দাঁড়াবো? দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলিয়ে শেষ সম্বলটুকু রক্ষার জোর দাবি জানাচ্ছি।"
ওই এলাকার ভাঙনের মুখে থাকা দুলাল চন্দ্র, বাবলু মিয়া, গোপাল চন্দ্র, পুদিরাম চন্দ্র ও বেলাল মিয়াসহ ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেলার কথা বলা হলেও কাজের গতি অত্যন্ত ধীর। বাড়িঘর সম্পূর্ণ নদীতে চলে যাওয়ার পর জিও ব্যাগ ফেললে তাতে তাদের কোনো উপকার হবে না। তাই অবিলম্বে কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তারা।
উল্লেখ্য, গত বছরও তিস্তার ভাঙনে ওই এলাকার ১৫ থেকে ২০টি পরিবার বাস্তুহারা হয়েছিল। তারা কোনো রকমে অন্যের জমিতে ঘর তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, জিও ব্যাগ দিয়ে তিস্তার ভাঙন রোধে কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ.টি.এম আরিফ জানান, তিস্তার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে দ্রুত জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জেএস

আবুল কালাম আজাদ, উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
© 2026 Daily Destiny. All rights reserved.







