সড়ক দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যু ম্লান হওয়ার পথে মেধাবী শ্রাবন্তীর স্বপ্ন

ছবি: প্রতিনিধি
বাবার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে চরম অভাব আর প্রতিকূলতার মধ্যেও এখনও পড়ার টেবিলে বসে আছে কিশোরী শ্রাবন্তী। অভাব তাকে থামিয়ে দিতে চাইলেও তার চোখজুড়ে এখনও জ্বলজ্বল করছে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন। এখন কেবল প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের একটু সহানুভূতির হাত, যাতে একটি সম্ভাবনাময় মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন অকালেই ঝরে না যায়।
বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখছে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া ইউনিয়নের মুরাদপুর পোনসাইর গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থী শ্রাবন্তী আক্তার। তার বাবারও প্রবল ইচ্ছে ছিল মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে দেখতে। কিন্তু এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর সেই স্বপ্ন আজ ম্লান হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
জানা যায়, অভাব-অনটনের সংসারে রাত জেগে বাজার পাহারা দিয়ে সামান্য কিছু উপার্জন করে পাঁচ কন্যা সন্তানের সংসার চালাতেন বাবা ছালাম মিয়া। সীমিত আয়ের মধ্যেই তিনি বড় তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট দুই মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্বও তিনি নিজের সাধ্যমতো পালন করে আসছিলেন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বিকেলে গৌরীপুর থেকে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুটুম্বপুর বাসস্ট্যান্ডে বাস থেকে নামার পরপরই একটি দ্রুতগামী লরি তাকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দিনই রাত সাড়ে তিনটার দিকে তিনি মারা যান।
নিহত ছালাম মিয়ার স্ত্রী রুবি আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "আমার কোনো ছেলে সন্তান নেই, শুধু পাঁচটি মেয়ে। আমার স্বামীই ছিল আমাদের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি বাজার পাহারা দিয়ে যে বেতন পেতেন, তা দিয়েই কোনো রকমে আমাদের সংসার চলত। স্বামী মারা যাওয়ার পর আমাদের সংসার চালানোর মতো আর কেউ নেই। মানুষের সাহায্য-সহযোগিতায় এখন অনেক কষ্টে দিন কাটছে। সরকার যদি আমাদের কিছু আর্থিক অনুদান দেয় এবং আমার মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব নেয়, তাহলে শ্রাবন্তী তার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।"
বর্তমানে শ্রাবন্তী কুটুম্বপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবার মৃত্যুর পর অর্থাভাবে তার ছোট বোন সেঁজুতির পড়াশোনা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে শত কষ্ট ও অভাবের মধ্যেও আত্মীয়স্বজন ও সমাজের সহৃদয়বান মানুষের সামান্য সহযোগিতায় নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে শ্রাবন্তী।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শ্রাবন্তী আক্তার বলে, "আমার স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়া। আমার বাবারও অনেক স্বপ্ন ছিল আমাকে পড়ালেখা শিখিয়ে সরকারি চাকরিতে দেখতে। বাবা সব সময় আমাকে পড়াশোনা করতে উৎসাহ দিতেন। বাবাকে হারানোর পর আমাদের সংসারে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। অনেক সময় না খেয়েও থাকতে হয়। তারপরও আমি আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই, পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চাই।"
মুরাদপুর বাজারের ব্যবসায়ী মো. আব্দুল বাতেন মেম্বার বলেন, "ছালাম ভাইয়ের পরিবার বর্তমানে অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় রয়েছে। শ্রাবন্তী অত্যন্ত মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। আর্থিক সংকটের কারণে যদি তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এটি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্যই অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য আকুল আবেদন জানাচ্ছি।"
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম মিয়া জানান, ছালাম মিয়া অত্যন্ত সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন এবং সব সময় তার মেয়েদের শিক্ষিত করার কথা বলতেন। তার মৃত্যুর পর সেই স্বপ্ন যেন থেমে না যায়, সে জন্য সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের এগিয়ে আসা উচিত।
শ্রাবন্তীর পরিবার ও এলাকাবাসীর জোরালো দাবি, মেধাবী শিক্ষার্থী শ্রাবন্তীর পড়াশোনা সচল রাখতে সরকারি বৃত্তি, নিয়মিত আর্থিক অনুদান কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশেষ সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে এই অসহায় পরিবারটির বেঁচে থাকার জন্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিশেষ সহায়তার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেএস









