বন্যায় ফসল ভেসে যাওয়ায় সর্বস্বান্ত জসিমঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায়

ছবি: প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে। তলিয়ে গেছে নিচু এলাকার ফসলি জমি, আমনের বীজতলা, আউশ ধান, সবজি ক্ষেত ও পানের বরজ। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কৃষকদের হাজার হাজার বিঘার স্বপ্নের ফসল পানিতে ভেসে গেছে। বন্যায় সর্বস্বান্ত হওয়া এসব কৃষকেরই একজন পদুয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পদুয়ার মালি পাড়ার প্রান্তিক কৃষক জসিম উদ্দিন।
তিন ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে কোনো রকমে সংসার চালাতেন তিনি। পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার আশায় বিভিন্ন সমবায় সমিতি, এনজিও ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ও শর্তে ঋণ নিয়ে প্রায় ৮ শতক (৮০০ শতক) জমিতে লাউ, চিচিঙ্গা, তিতকরলা, বরবটি, পেঁপে, ঢেঁড়স, কলা, চালকুমড়া, আউশ ও আমন ধানের আবাদ করেছিলেন তিনি।
কিন্তু সম্প্রতি টানা প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় তার চাষ করা পুরো ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। চোখের সামনে সব ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বন্যা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থার ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং সংসার চালানো নিয়ে এখন চরম দুশ্চিন্তা ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এই কৃষক।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক এই বন্যায় উপজেলার ৯ হাজার ৪০০ জন কৃষকের ১৫০ হেক্টর শস্যক্ষেত, ৫ হেক্টর পানের বরজ এবং ৩৬০ হেক্টর আউশ ও আমনের বীজতলা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উপজেলায় সর্বমোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ১৪ লাখ ১০ হাজার ৫০০ টাকা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক জসিম আকুতি জানিয়ে বলেন, "পরিবারের সুখের আশায় প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে এক লাখ, পদক্ষেপ থেকে দুই লাখ, মুসলিম এইড থেকে তিন লাখ এবং ইসলামী ব্যাংক থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির সবজি চাষ এবং আউশ ও আমনের বীজতলা করেছিলাম। কিন্তু বন্যার পানি ঢুকে ক্ষেতের সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। একদিকে সংসারের খরচ, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধ—এই দুই সমস্যা কীভাবে সামলাব, তা ভেবে হতাশ হয়ে পড়ছি। এ মুহূর্তে সরকার আমাদের পাশে এসে না দাঁড়ালে মরণ ছাড়া কোনো পথ আছে বলে মনে হচ্ছে না।"
স্থানীয় কৃষক চাষী মিয়া জানান, উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন জসিম। তার কৃষি কার্ড থাকলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সহজ শর্তের ঋণ দেয় না। বন্যায় তার ক্ষেতের সবকিছু ধ্বংস হয়ে তিনি আজ সর্বস্বান্ত। তাই এই বিপদের সময়ে সরকারের উচিত দ্রুত তার পাশে এসে দাঁড়ানো।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আজিম বলেন, এবারের বন্যায় জসিমের সবজি ক্ষেতের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে তার দীর্ঘ সময় লাগবে। একদিকে তিনি ঋণগ্রস্ত, অন্যদিকে বন্যায় নিঃস্ব। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও ব্যাংকে নিয়মিত সাপ্তাহিক ও মাসিক কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় বর্তমানে তাকে নানা লাঞ্ছনার মুখে পড়তে হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাজী শফিউল ইসলাম জানান, টানা বৃষ্টি ও বন্যায় উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণের কাজ চলছে। সরকারি কোনো প্রণোদনা বা সুযোগ-সুবিধা আসলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাছাই করে তা বিতরণ করা হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ স্বাভাবিক হলে কৃষকেরা যাতে দ্রুত পুনরায় আবাদ শুরু করতে পারেন, সে জন্য তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।
জেএস

রুশমী আক্তার, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
© 2026 Daily Destiny. All rights reserved.








