চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কে স্থায়ী পানিবদ্ধতা: অচল ২০ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা

ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়ক কেবল একটি যাতায়াতের পথ নয়, এটি উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের লক্ষাধিক মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান ধমনী। কিন্তু প্রতি বর্ষা এলেই মহাসড়কের প্রায় তিন থেকে চার কিলোমিটার অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চল কার্যত অচল হয়ে পড়ে। দীর্ঘস্থায়ী এই জলাবদ্ধতায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্য।
অক্সিজেন মোড় থেকে বড়দিঘির পাড় হয়ে চৌধুরীহাট পর্যন্ত অংশ বর্ষার সময় চার থেকে পাঁচ ফুট পানির নিচে তলিয়ে থাকে। স্বাভাবিক সময়ে যে পথ অতিক্রম করতে ২৫-৩০ মিনিট সময় লাগে, বৃষ্টির দিনে সেখানে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। অনেক সময় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের কোমরসমান পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। ২০১৫ সালে কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয়ে মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হলেও, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় এর সুফল পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা।
এই মহাসড়ক অচল হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রায় ২০ লাখ মানুষের ওপর:
শিক্ষায় বিঘ্ন: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী এই পথের ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস আটকা পড়ায় ক্লাস, পরীক্ষা ও গবেষণার মতো প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবায় ঝুঁকি: রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও হাটহাজারী থেকে মুমূর্ষু রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধতায় আটকা পড়ে থাকছে। চিকিৎসকদের মতে, জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে এই বিলম্ব জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি: চট্টগ্রাম নগরের সঙ্গে শিল্প ও কৃষিপণ্যের যোগসূত্র এই সড়ক। জলাবদ্ধতার ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পণ্য নষ্ট হওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক বাজারদরে।
জলাবদ্ধতার নেপথ্যে কী?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব:
১. ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত ত্রুটি: সড়ক প্রশস্তকরণের সময় পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা বা পর্যাপ্ত বক্স কালভার্ট তৈরি করা হয়নি।
২. প্রাকৃতিক খাল ভরাট: রেললাইনের পাশের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল ও পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক খালগুলো দখল বা ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নামতে পারছে না।
৩. অপরিকল্পিত নগরায়ণ: সড়কের দুই পাশে নির্বিচারে আবাসিক ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের ফলে পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও চুয়েটের স্থাপত্য অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, “এটি কেবল একটি সড়কের সমস্যা নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য পুরো এলাকার ক্যাচমেন্ট এলাকা বিবেচনা করে সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন জরুরি। শুধু সড়ক উঁচুকরণ বা প্রশস্তকরণের মাধ্যমে এই সমস্যা মিটবে না।”
চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোসলেহ্উদ্দীন চৌধুরী স্বীকার করেছেন, সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। তিনি জানান, স্থায়ী সমাধানের জন্য কালভার্টের সক্ষমতা বাড়ানো এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে উন্নত করতে কারিগরি সমীক্ষার প্রয়োজন।
প্রতি বছর বর্ষা এলেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনে আসেন, নানা প্রতিশ্রুতি দেন—কিন্তু বর্ষা শেষে সমস্যার সমাধান আর হয় না। স্থানীয়দের দাবি, দায়সারা পরিদর্শনের পরিবর্তে খাল পুনরুদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং বড় আকারের বক্স কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে এই মহাসড়ককে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতামুক্ত করা হোক।
উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবন বাঁচানো এবং যাতায়াত ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
জেএস

চট্টগ্রাম ব্যুরো
© 2026 Daily Destiny. All rights reserved.








