আর্জেন্টিনা স্পেন মহারণ আজ

গ্রাফ: ডেসটিনি
ফুটবল কেবল খেলা নয়, এ যেন এক সবুজ ক্যানভাসে বুনে যাওয়া মহাকাব্য। আর আজ, সেই মহাকাব্যের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় রচনার দিন। একদিকে লাতিন আমেরিকার হৃদস্পন্দন, নীল-সাদার আবেগে জড়ানো আর্জেন্টিনা; অন্যদিকে ইউরোপীয় নান্দনিকতার প্রতীক, পাসিংয়ের জাদুকর লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম আজ কোনো সাধারণ মাঠ নয়, এ যেন এক আধুনিক কলোসিয়াম, যেখানে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরার লড়াইয়ে নামবে ফুটবল বিশ্বের দুই মহানায়ক। একদিকে তানগো নৃত্যের গতি আর ম্যারাডোনা-মেসির রেখে যাওয়া জাদুকরী উত্তরাধিকার, যা বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের চোখে জয়ের স্বপ্ন আঁকে।
অন্যদিকে টিকি-টাকা ছন্দের সম্মোহনী শক্তি, যা ক্ষুরধার আক্রমণে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে করে তোলে দিশেহারা। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায় এক অদ্ভুত সমতা , ৪টি লড়াইয়ে দুই দলেরই জয় সমান ছয়টি করে। এই সমীকরণই বলে দেয়, আজকের যুদ্ধ কতটা সমানে-সমান, কতটা অগ্নিগর্ভ।কৌশলগত দ্বৈরথ: মাঠের ভেতরের দাবার চালআজকের এই ৯০ মিনিটের মহারণ কেবল ট্রফি ছোঁয়ার লড়াই নয়; এটি ফুটবল সংস্কৃতির সংঘাত ও কৌশলের দাবার চাল।
বাঁশির প্রতিটি আওয়াজে আজ কাঁপবে গ্যালারি, প্রতিটি পাসে থমকে যাবে কোটি চোখ। ফুটবল দেবতা আজ কার কপালে এঁকে দেবেন বিজয়ের তিলক? নীল-সাদার স্বপ্ন পূরণ হবে, নাকি লা রোহার লাল সূর্য জ্বলজ্বল করবে বিশ্বমঞ্চেÍতার উত্তর লুকিয়ে আছে আজকের এই মহাকাব্যিক লড়াইয়ে।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে এই মেগা ফাইনাল যে মোটেই সহজ হবে না, তা খুব ভালো করেই জানেন স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রি। ম্যানহাটনে এক ঠাসা সংবাদ সম্মেলনে ম্যানচেস্টার সিটির এই মিডফিল্ডার পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, আর্জেন্টিনার ‘শারীরিক’ ও আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং মাঠের যেকোনো উসকানি সামলে নিজেদের স্বাভাবিক খেলা খেলতেই মুখিয়ে আছে তার দল।
মাঠে লাতিন আমেরিকান দলগুলোর চিরাচরিত স্লেজিং বা উসকানিমূলক আচরণের মুখোমুখি হতে হবে কি নাÍএমন প্রশ্নে স্প্যানিশ দলপতির জবাব ছিল বেশ কূটনৈতিক, ‘দেখুন, এটা ফুটবলেরই একটা অংশ। ম্যাচ কোন দিকে মোড় নেয়, তা মাঠেই দেখা যাবে। আমি বিশ্বাস করতে চাই আর্জেন্টিনা নিজেদের সবটুকু উজাড় করে খেলবে, সস্তা কোনো কৌশলের আশ্রয় নেবে না। তবে মাঠের পরিস্থিতি যদি তেমন রূপ নেয়ও, আমাদের কাজ হবে মাথা ঠান্ডা রাখা। কোনো ধরনের প্ররোচনায় পা না দিয়ে নিজেদের আসল খেলাটা খেলে যাওয়া।’
ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলতে নামা আর্জেন্টাইন জাদুকর লিওনেল মেসিকে সমীহ জানাতে অবশ্য কার্পণ্য করেননি রদ্রি। মেসিকে ফুটবলের ‘সর্বকালের সেরা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েও প্রতিপক্ষকে প্রচ্ছন্ন এক হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখলেন তিনি, ‘ফুটবলার হিসেবে মেসি কী, কিংবা আর্জেন্টিনার জন্য তার অবদান কতটাÍসেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার চোখে ওই সর্বকালের সেরা। তবে আর্জেন্টিনা দলটা কেবল মেসির ওপর নির্ভরশীল নয়। তারা প্রমাণ করেছে যে উচ্চমানের ফুটবলারদের নিয়ে গড়া দারুণ এক ভারসাম্যপূর্ণ দল এটি। তাই লিওকে নজরে রাখার পাশাপাশি বাকিদের নিয়েও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
লিওনেল মেসির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তবে আর্জেন্টিনার অধিনায়কের প্রশংসার মধ্য দিয়ে আরও একটি কাজ করেছেন স্পেন কোচ। ফুয়েন্তে বলেছেন, মেসি নাকি এখনও ১৯ বা ২৩ বছর বয়সী তরুণের মতো খেলেন। কাকতালীয়ভাবে ফুয়েন্তের দলে দুজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আছেন, যাদের বয়স ১৯ ও ২৩ বছর। সেই দুজন হলেন উইঙ্গার লামিনে ইয়ামাল ও সেন্টার-ব্যাক পাউ কুবারসি। শুধু এই দুজনের বয়সই কম নয়, এবারের বিশ্বকাপে যে কটি দল তারুণ্যময় স্কোয়াড নিয়ে এসেছে, ‘লা রোজা’রা তাদের অন্যতম।
মেসির যেসব গুণগুলো তার নজরে পড়েছে, নিজের দলকেও সম্ভবত ফাইনালে ঠিক সেভাবেই সাজাচ্ছেন তিনি। তবে ফাইনালে তারুণ্যের স্কোয়াড হতে পারে স্পেনের অন্যতম শক্তি বলে মত তার।
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ফাইনালের পথটা ছিল নাটকীয়তায় ভরা। নকআউট পর্বে কেপ ভার্দেকে অতিরিক্ত সময়ে হারানো, মিশরের বিপক্ষে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিতর্কিত জয়, এরপর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেও পিছিয়ে পড়েও নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জেতাÍআলবিসেলেস্তেদের মানসিক দৃঢ়তারই প্রমাণ দেয়। আর্জেন্টিনার এই লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করে রদ্রি বলেন, ‘প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে যেভাবে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা তাদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ চরিত্রের কথাই বলে। আমরা বিষয়টি মাথায় রাখছি। আমরা জানি তারা কেমন দল, তবে তাদের শক্তি অনুযায়ী কোথায় আঘাত করতে হবে, সেই পরিকল্পনাও আমাদের জানা আছে।’
সেমিফাইনালে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট ফ্রান্সের শক্তিশালী আক্রমণভাগকে বোতলবন্দি করে এবং মাঝমাঠের আধিপত্য ধরে রেখে ফাইনালে পা রেখেছে স্পেন। ফরাসিদের বিরুদ্ধে সেই পারফরম্যান্সকে স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা হিসেবে দেখছেন রদ্রি।
ফাইনালের আগে টিওআইসি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, ‘ওরা দুর্দান্ত একটি দল। চমৎকার সব খেলোয়াড় আর দারুণ ফুটবলশৈলী রয়েছে তাদের। দলটিকে আমি খুব ভালো করেই চিনি। বহু বছর ধরে তারা নিজেদের একটি নির্দিষ্ট ফুটবল দর্শন ধরে রেখেছে। তাদের অনেক খেলোয়াড়কে আমি চিনি, তাদের বিপক্ষে খেলেছি এবং এখনও তাদের খেলা অনুসরণ করি। কয়েকজন তো বার্সেলোনায় খেলে, যে ক্লাবকে আমি মন থেকে ভালোবাসি। এটি একটি বিশেষ ম্যাচ, বিশ্বকাপের ফাইনাল। আমার বিশ্বাস, ম্যাচটি খুবই হাড্ডাহাড্ডি হবে।’ সমর্থকদের উদ্দেশে মেসি বলেন, ‘আমরা যেভাবে এই মুহূর্তটি উপভোগ করছি, আপনারাও সেভাবেই উপভোগ করুন। আমরা আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছি এবং আর্জেন্টিনাকে বিশ্বের সেরা দুই দলের একটিতে পরিণত করেছি। গত চার বছর ধরে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে যে আনন্দ পেয়েছি, এবারও সেই মঞ্চে ফিরেছি। এখন বাকিটা ঈশ্বরের ইচ্ছা।’
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে প্রতিপক্ষ স্পেনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে উঠে আসছেন তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল। তার প্রতিভার অকুণ্ঠ প্রশংসা করলেও মাঠে তাকে কোনো ছাড় দিতে রাজি নন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচের আগে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে মেসি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আর্জেন্টিনার লক্ষ্যই হবে এমনভাবে খেলা, যাতে ইয়ামাল নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে না পারেন। একই সঙ্গে ফাইনালের চাপ, নিজের মানসিকতা এবং শিরোপা ধরে রাখার প্রত্যয় নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই ফুটবলার।
ফাইনালের চাপ প্রসঙ্গে মেসি বলেন, তারা কখনো চাপকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। খেলাটিকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, আর্জেন্টিনা প্রতিযোগিতাপূর্ণ একটি দল এবং তারা জিততে ভালোবাসে। তবে ফুটবল দলীয় খেলা, যেখানে প্রতিপক্ষও সমানভাবে লড়াই করে। তাই সব সময় জয় সম্ভব নয়। ছোটবেলায় জয়ের চেয়ে পরাজয়ের অভিজ্ঞতাই বেশি হয়েছে উল্লেখ করে মেসি বলেন, সেই হারগুলোই তাকে ব্যক্তি ও ফুটবলার হিসেবে আরও পরিণত করেছে।
স্পেন দল নিয়েও উচ্চ প্রশংসা করেন মেসি। তিনি বলেন, স্পেনের দলে অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার রয়েছেন এবং তাদের খেলার ধরনও দারুণ। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনারও নিজস্ব শক্তি রয়েছে, যা কাজে লাগিয়ে শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে দলটি।
একই অনুষ্ঠানে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিও নিজের অনুভূতির কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার অন্যতম কারণই ছিলেন মেসি। তবে তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছে, তা প্রকাশ করতে চাননি স্কালোনি। শুধু বলেন, অনেক দিন পর দেখা হওয়ায় তিনি মেসিকে নিজের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। মেসির প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন আর্জেন্টাইন কোচ।
এমেরিক লাপোর্ত বনাম লিওনেল মেসি: মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ৩৯ বছরে পা দিলেও মেসির ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতায় একটুও ভাটা পড়েনি। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আট গোল ও চার অ্যাসিস্ট নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আছেন শীর্ষে। শুধু তা–ই নয়, ২১ গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাও এখন তিনিই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে তাঁর দুটি অ্যাসিস্টেই ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে পেয়েছিল আর্জেন্টিনা।
স্পেনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই মেসিকে থামানো। কাজটা অবশ্য একা এমেরিক লাপোর্তের নয়। রদ্রি, লাপোর্ত ও পাউ কুবারসিকে মিলেই ছোট করতে হবে মেসির খেলার জায়গা। তবে সেই রক্ষণভাগের নেতৃত্ব থাকবে অভিজ্ঞ লাপোর্তের কাঁধেই। ১৯ বছর বয়সী কুবারসিকে পাশে নিয়ে তিনি গড়েছেন দুর্দান্ত এক জুটি। সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে স্পেন, নকআউট পর্বে ছিল প্রায় দুর্ভেদ্য। লাপোর্তের পজিশনিং, স্থিরতা ও নেতৃত্ব ছিল এর বড় কারণ। কিন্তু ফাইনালে তাঁর সামনে এমন একজন ফুটবলার, যিনি এক মুহূর্তেই বদলে দিতে পারেন ম্যাচের গল্প।
লামিন ইয়ামাল বনাম নিকোলাস তালিয়াফিকো: দুজনের বয়সের ব্যবধান ১৪ বছর! কিন্তু ১৯ বছর বয়সী ইয়ামাল স্পেনের আক্রমণভাগের সবচেয়ে ক্ষিপ্র তারকা। সেখানে, ৩৩ বছর বয়সী তালিয়াফিকো আর্জেন্টিনার রক্ষণ দেয়ালের সবচেয়ে শক্ত পাথর; সরানো তো দূর অস্ত, নড়ানোই কঠিন! ইয়ামাল অবশ্য চলতি আসরে এখনও প্রত্যাশার প্রতিদান দিতে পারেননি পুরোটা। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট নিয়ে শুরুতে তাকে ভুগতে হয়েছে। এরপর মাঠে ফিরে দেখিয়েছেন, যখন-তখন জ্বলে উঠতে পারেন তিনি।
গতি ও বক্সের ভেতরে বিপজ্জনক এলাকায় ক্ষিপ্র ছোটাছুটি করে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে পেনাল্টি এনে দেন দলকে। মিকেল ওইয়ারসাবাল তা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে নেন ‘লা রোজা’দের। তরুণ ইয়ামালের কল্পনাশক্তি, খেলা পড়তে পারার দক্ষতার প্রমাণ মিলছে ফিফার সৃজনশীলতার ‘পাওয়ার রযাস ঙ্কিংয়ে’ তার ছয় নম্বরে অবস্থানে। ইয়ামালকে বোতলবন্দি করে রাখার দায়িত্ব অভিজ্ঞ তালিয়াফিকোর পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। গত বিশ্বকাপে এই লেফট-ব্যাক ছিলে আর্জেন্টিনার জয়ের নায়কদের একজন। মাঝের সময়ে ঋদ্ধ হয়েছেন আরও। চলতি আসরেও আলবিসেলস্তেদের রক্ষণে অভিজ্ঞতার ছাপ রেখে চলেছেন তিনি।
রদ্রি বনাম এন্সো ফের্নান্দেস : মেসি ও ইয়ামালকে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে হলে ঠিকঠাক পেতে হবে বলের যোগান। সেটা আসবে মাঝমাঠ থেকে। মাঝমাঠ দখলের তুমুল লড়াই হতে পারে রদ্রি ও এন্সো ফের্নান্দেসের মধ্যে। রদ্রি শুরু থেকেই আছেন দুর্দান্ত ফর্মে, ফের্নান্দেস দেরিতে হলেও খুঁজে পেয়েছেন নিজেকে। রদ্রি আবার স্পেন দলের অধিনায়ক। ফলে, তার দায়িত্বের ভার যে কারো চেয়ে বেশি। সেটা তিনি বয়েও চলেছেন অবিশ্বাস্য আস্থায়। প্রতিটি ম্যাচে নিখুঁত পাসের যোগান রেখেছেন অব্যাহত। চলতি আসরে, রদ্রির চেয়ে সফল পাস (৬৪৮টি) দিতে পারেননি আর কেউ। তার সঠিক পাস দেওয়ার সক্ষমতাও ঈর্ষণীয়, শতকরা ৯৩ শতাংশ!
শারীরিক সামর্থ্য ও দমের প্রমাণও রদ্রি দিয়েছে। ৮৩ হাজার ৮০২ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করে এখন তিনি টুর্নামেন্টের রেকর্ডধারী। প্রতিপক্ষের আক্রমণের তাল মাঝমাঠে কেটে দিতে তার জুড়ি মেলা ভার। একই কাজ তিনি আরও সূচারুভাবে করতে চাইবেন ফাইনালে। কিন্তু সেখানে নিশ্চিতভাবে বাধ সাঁধবেন ফের্নান্দেস। রদ্রির জন্য ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ হয়ে মাঠে নামার সামর্থ্য আছে এই আর্জেন্টাইনের।
সাড়ে তিন বছর আগের বিশ্বকাপে, ফিফা সেরা তরুণ ফুটবলারের পুরস্কার জয়ী ফের্নান্দেস বল পায়ে তো বটেই, বল ছাড়াও অক্লান্ত পরিশ্রমের সামর্থ্য, মানসিকতা-দুটোই আছে। এ পর্যন্ত ৪৩ বার বল পুনরুদ্ধার করেছেন তিনি, যা আর্জেন্টিনার যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি। ফের্নান্দেসের আবার প্রয়োজনের সময় গোল করার বাড়তি গুণও আছে।
মিশরের বিপক্ষে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায় পড়া আর্জেন্টিনাকে যোগ করা সময়ে জয়সূচক গোলটি তিনি এনে দিয়েছিলেন দুর্দান্ত হেডে। সেমি-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দলের শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছিল, তখনও তিনি আসেন ত্রাতা হয়ে। মেসির পাস ধরে বক্সের বাইরে থেকে দৃষ্টিনন্দন গোলে ফেরান সমতা। পরে জয়সূচক গোলটি করেন লাউতারো মার্তিনেস।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-স্পেন মুখোমুখি পরিসংখ্যান: : বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও স্পেন এর আগে মাত্র একবার মুখোমুখি হয়েছে, আর সেই ম্যাচে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। ১৯৬৬ সালের সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে স্পেনকে হারায়। আর্জেন্টিনার হয়ে দুটি গোল করেন লুইস আর্তিমে, আর স্পেনের হয়ে সাময়িক সমতা ফেরান পির্রি। ওই আসরে স্পেন গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেয়, আর আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে ছিটকে পড়ে।
সব ধরনের প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ মিলিয়ে স্পেন ও আর্জেন্টিনা মোট ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে। সামগ্রিক পরিসংখ্যানে দুই দলই সমান অবস্থানে রয়েছে। আর্জেন্টিনা জিতেছে ৬টি ম্যাচ, স্পেনও জিতেছে ৬টি, আর বাকি ২টি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
আর্জেন্টিনা ও স্পেন সর্বশেষ মুখোমুখি হয়েছিল ২০১৮ সালের মার্চ মাসে। সেই ম্যাচে লা রোহা ৬-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে লা আলবিসেলেস্তেকে উড়িয়ে দেয়। তখন লিওনেল স্কালোনি প্রধান কোচ ছিলেন না, তবে তিনি হোর্হে সাম্পাওলির কোচিং স্টাফের সদস্য ছিলেন। অন্যদিকে, স্পেনের কোচ ছিলেন হুলেন লোপেতেগি, যিনি ২০১৮ বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে নাটকীয়ভাবে দায়িত্ব ছেড়ে দেন।
স্পষ্টতই, এরপর দুই দলেই অনেক পরিবর্তন এসেছে। ২০১৮ সালের পর আর্জেন্টিনা দুটি কোপা আমেরিকার শিরোপা এবং একটি ফিফা বিশ্বকাপ জিতেছে। অন্যদিকে স্পেন তাদের সাফল্যের তালিকায় একটি উয়েফা ইউরো শিরোপা যোগ করেছে। ২০১৮ সালে এটি ছিল দুই ঘুমন্ত পরাশক্তির লড়াই। আর ২০২৬ সালে মুখোমুখি হবে দুই অদম্য শক্তি।
ইউ

শাফিউল আল ইমরান
© 2026 দৈনিক ডেসটিনি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।











