ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ছিল কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং এটি ছিল এক উচ্চমার্গীয় ‘রাজনৈতিক প্রদর্শনী’ ও প্রতীকী কূটনীতির মঞ্চ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জানাজার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের সামনে তিলাওয়াত করা পবিত্র কোরআনের বিশেষ আয়াতগুলোর মাধ্যমে তেহরান বিশ্বনেতাদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন ও সূক্ষ্ম বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, খামেনির শেষ বিদায়ে সৌদি প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে সূরা আল-ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যেখানে বদর যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরানের জয়ের সংকল্পের প্রতিফলন। এই আয়াত নির্বাচনের মাধ্যমে রিয়াদের প্রতি একই সাথে প্রশংসা ও বিদ্রূপ—দুটোই প্রচ্ছন্নভাবে জানানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানাজায় ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার যে চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল করেছিল, তাতে তারা সফল হয়নি। তেহরান তার মিত্রদের আশ্বস্ত করেছে যে, রাষ্ট্র এখনো ঐক্যবদ্ধ ও অপরাজেয়।

প্রতিনিধিদল অনুযায়ী আয়াতের ভিন্নতা:

তেহরান প্রতিটি দেশের অবস্থান ও ইরানের প্রতি তাদের সম্পর্কের গভীরতা অনুযায়ী আলাদা আয়াত বেছে নিয়েছিল:

প্রতিরোধ শিবির ও ঘনিষ্ঠ মিত্র: হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি, হাশদ আল-শাবি এবং তালেবানের মতো গোষ্ঠীর জন্য বাছাই করা আয়াতগুলোতে শাহাদাত, বিজয় এবং আল্লাহর প্রতি অটল অঙ্গীকারের বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষ করে হিজবুল্লাহ ও হামাসের জন্য নির্বাচিত আয়াতগুলো সামরিক বিপর্যয়ের মধ্যেও চূড়ান্ত বিজয়ের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে।

রাশিয়া, চীন, ভারত ও মিশর: এই দেশগুলোর প্রতিনিধিদলের জন্য অপেক্ষাকৃত শান্ত মেজাজের আয়াত পাঠ করা হয়েছে, যা যুদ্ধের বার্তার চেয়ে সততা, আশ্বাস ও পারস্পরিক কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কাতার, তুরস্ক ও পাকিস্তান: মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখা এসব দেশের প্রতিনিধিদের স্বাগত জানাতে মধ্যম পর্যায়ের আয়াত বেছে নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের জন্য পঠিত আয়াতে সম্মানের সাথে প্রস্থান করার দোয়ার মাধ্যমে সেতুবন্ধনের চেষ্টার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

লেবানন সরকার: লেবানন সরকারের জন্য সূরা আন-নিসার ৬৬ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, যা বেশ কঠোর ও সমালোচনামূলক। এটি মূলত ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লেবানন সরকারের আত্মত্যাগহীন ভূমিকার প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন তিরস্কার বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনি নিহত হন। ইরান তার মিত্রদের বার্তা দিয়েছে যে, তারা প্রতিটি দেশের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছে এবং যুদ্ধের কঠিন সময়ে কারা পাশে ছিল আর কারা নীরব ছিল, তা তেহরানের স্মরণে রয়েছে। এই ‘আয়াত-কূটনীতি’র মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে দেখিয়েছে যে, তারা তাদের হিসাব অত্যন্ত কৌশলী ও সূক্ষ্মভাবে সম্পন্ন করছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই (এলিস জেভোরি ও মারওয়া কোচাক কর্তৃক রচিত প্রতিবেদন)

জেএস