আজ গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ১০০০তম দিন পূর্ণ হলো। গত প্রায় তিন বছরে ৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের এই উপত্যকাটি এখন কার্যত একটি ‘উন্মুক্ত কারাগার’-এ পরিণত হয়েছে। গণহত্যা, ধর্ষণ, নৃশংসতা আর চরম ধ্বংসযজ্ঞের এক ভয়াবহ সাক্ষী হয়ে আছে পুরো বিশ্ব। গাজার স্থানীয় সরকারের মিডিয়া অফিসের সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে যুদ্ধের এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির খণ্ডচিত্র উঠে এসেছে।

ধ্বংসের ভয়াবহ পরিসংখ্যান

গাজার স্থানীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় ২ লাখ ২৩ হাজার টনেরও বেশি বিস্ফোরক নিক্ষেপ করেছে। উপত্যকার ৮০ শতাংশেরও বেশি এলাকা এখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। প্রাণহানির যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে তা শিহরণ জাগানোর মতো:

নিহত: ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি, যার মধ্যে ২১ হাজার ৫০০ জনের বেশি শিশু এবং ১২ হাজার ৫০০ জনের বেশি নারী।

নিখোঁজ: প্রায় ৯ হাজার ৫০০ জন মানুষ।

এতিম: প্রায় ৫৮ হাজার ৮০০ শিশু মা-বাবা হারিয়েছে।

আহত: ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জন, যাদের মধ্যে ৫ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন।

স্বাস্থ্যঝুঁকি: সংক্রামক রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২১ লাখ ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ৭১ হাজার ৩৩৮ জন ভাইরাল হেপাটাইটিসে ভুগছেন। এছাড়া ১ হাজার ৫০০ জন পক্ষাঘাতে আক্রান্ত এবং ১ হাজার ২০০ জন দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।

ইসরায়েলি কারাগারে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ

শুধুমাত্র যুদ্ধের ময়দানেই নয়, ইসরায়েলি কারাগারেও ফিলিস্তিনিদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর পুলিৎজার বিজয়ী কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ১৪ জন ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, ইসরায়েলি সেনা ও কারারক্ষীদের দ্বারা ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষরা ব্যাপক যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ক্রিস্টফ তাঁর কলামে উল্লেখ করেছেন, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের তৈরি ‘নিরাপত্তা কাঠামো’র কারণেই এই যৌন সহিংসতা যেন এক নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।

অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনৈতিক ধ্বংস

গাজার ধর্মীয় ও চিকিৎসা অবকাঠামো ধ্বংসের মুখে:

ধর্মীয় স্থাপনা: ১ হাজার ৪৭টি মসজিদ সম্পূর্ণ এবং ২১০টি আংশিক ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া ৩টি গির্জায় হামলা চালানো হয়েছে এবং ৩১২ জন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নিহত হয়েছেন।

স্বাস্থ্যসেবা: ৩৮টি হাসপাতাল, ৯৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ১৯৭টি অ্যাম্বুলেন্স অচল হয়ে পড়েছে।

আবাসন: ৩ লাখ ৩৫ হাজার ভবন সম্পূর্ণ এবং ৭ লাখ ৩৭ হাজার ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আর্থিক ক্ষতি: যুদ্ধের কারণে গাজায় মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে কেবল আবাসন খাতেই ক্ষতি ৩৪ বিলিয়ন ডলার।

যুদ্ধবিরতি ও বর্তমান বাস্তবতা

২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযান ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গাজা সরকারের দাবি, এরপর থেকে এ পর্যন্ত ৩৫০০ বারেরও বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে ইসরায়েল। অবিরত বোমাবর্ষণ এবং মানবিক সহায়তায় বাধার কারণে গাজাবাসীর জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

বিশ্বের হাজারো সচেতন মানুষের চোখের সামনে গাজা আজ কেবল ধ্বংসস্তূপের নাম নয়, বরং এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক চরম ও জঘন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেএস