দক্ষিণ চট্টগ্রামে বন্যার নেপথ্যে কি?

ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ চট্টগ্রামে প্রতিবছরই বন্যার প্রকোপ বাড়ছে। আগে বন্যা হলেও পানি দু-একদিনের মধ্যে নেমে যেত, কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ জনপদ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পানির নিচে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল কি একমাত্র কারণ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ কোনো পরিবেশগত বিপর্যয়?
সরেজমিনে তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্যার এই দীর্ঘস্থায়িত্বের পেছনে অতিবৃষ্টির পাশাপাশি নদী-খাল দখল, নিয়মিত খননের অভাব এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নযজ্ঞের এক সম্মিলিত নেতিবাচক প্রভাব কাজ করছে।
বান্দরবানের পাহাড় থেকে উৎপত্তি হওয়া হাঙ্গর খাল একসময় ছিল পাহাড়ি ঢলের পানির প্রধান নিষ্কাসন পথ। লোহাগাড়া ও সাতকানিয়ার বুক চিরে বয়ে যাওয়া এই খাল এখন মৃতপ্রায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, খালটির শেষ অংশ দখল ও পলি জমে ভরাট হয়ে নালায় পরিণত হয়েছে। ফলে পাহাড়ি ঢলের বিপুল জলরাশি নদীতে পৌঁছানোর আগেই লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। একইভাবে ডলু খাল, গড়াল খালসহ অগণিত শাখা খাল দীর্ঘদিন ধরে খনন না করায় নাব্যতা হারিয়েছে।
বন্যার পেছনে বহুমুখী কারণ
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই সংকটময় পরিস্থিতির পেছনে বেশ কিছু প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংস: আবাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা তৈরির লক্ষ্যে অসংখ্য পুকুর, বিল ও নিচু জমি ভরাট করা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রাকৃতিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে এলাকাটি।
অবৈধ দখল ও মৎস্যঘের: প্রভাবশালীরা নিজেদের স্বার্থে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ ও স্লুইস গেট বন্ধ করে রেখেছেন। বিশেষ করে মাছের ঘের তৈরি করতে গিয়ে অনেক জায়গায় পানির স্বাভাবিক চলাচলের পথ স্থায়ীভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে।
অবকাঠামোগত ত্রুটি: চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন এবং বিভিন্ন উঁচু সড়ক নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত কালভার্ট বা সেতু না রাখায় এগুলো অনেকটা 'বাঁধের' মতো কাজ করছে। ফলে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নামতে পারছে না।
নদীর নাব্যতা হ্রাস: সাঙ্গু ও ডলু নদীর তলদেশে পলি ও বালি জমে গভীরতা কমে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নদী উপচে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।
জোয়ারের প্রভাব: বঙ্গোপসাগরে জোয়ারের সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকায় বন্যার পানি সাগরে নামতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মো. বরকত আলী বলেন, "চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ভিন্ন। রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি ও জোয়ারের পানির সঙ্গে মানুষের তৈরি অপরিকল্পিত উন্নয়ন বন্যার পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। পাহাড় কাটার ফলে নেমে আসা মাটি নদী-খাল দ্রুত ভরাট করছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা।"
উত্তরণের উপায় কী?
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সূত্রে জানা গেছে, খাল খননের জন্য নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। তবে কেবল খননই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
১. নিয়মিত নদী ড্রেজিং ও খাল পুনঃখনন।
২. অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও জলাশয় সংরক্ষণ।
৩. অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করা এবং রেল ও সড়ক পথে পর্যাপ্ত পানি চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
৪. মৎস্যঘেরের নামে পানির প্রবাহ বন্ধকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
সমন্বিত হাইড্রোলজিক্যাল পরিকল্পনা ছাড়া এই স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও বন্যার হাত থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে রক্ষা করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্ষা এলে এখন আর প্রকৃতির ওপর দোষ চাপিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই—প্রয়োজন এখনই কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ।
জেএস

চট্টগ্রাম ব্যুরো
© 2026 দৈনিক ডেসটিনি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।










