পদ্মার ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে জনপদঠিকানার খোঁজে দিশেহারা ৫০ হাজার মানুষ

ছবি: প্রতিনিধি
জন্মলগ্ন থেকেই পদ্মাচরের মানুষের জীবন ভাঙাগড়ার এক অন্তহীন লড়াই। নদীর গর্ভে বারবার বিলীন হয় বসতভিটে ও আবাদি জমি। ফলে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী নিজেদের স্থায়ী ঠিকানায় টিকতে পারছেন না তারা। কয়েক বছরের ব্যবধানেই বদলাতে হয় ঠিকানা। তবুও নাড়ির টানে মানুষ নিরাশা নিয়ে বেদনার ওই বালুচরেই গড়ে তোলে খেলাঘর। কিন্তু এই ৫০ হাজার মানুষের স্থায়ী বাসস্থান ও স্থায়ী ঠিকানার ব্যবস্থা করা কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? তাদের জীবনমান কি দেশের সার্বিক উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখছে না?
ভারতের ভাগীরথী নদী বাংলাদেশের পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করে পদ্মা নাম ধারণ করেছে। এই নদীর তীরবর্তী চরাঞ্চলে পাঁচ শতাধিক বছর আগে জনবসতি গড়ে ওঠে। নদীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে তাদের ভাঙাগড়ার জীবন। কালের আবর্তে বিভিন্ন শাসনামলের আওতাধীন ছিল এই চরাঞ্চল। এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠদের অনেকেই ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের কথা বলতে পারেন। সর্বশেষ স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স এখন ৫৫ বছর। দেশ এখন ডিজিটাল শিল্পায়নের যুগে প্রবেশ করেছে এবং বিশ্বব্যাপী এসডিজি লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে। মধ্যম আয়ের সভ্য জাতিতে উন্নীত হওয়ার যুদ্ধ চলছে সর্বত্র। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরাঞ্চলের ৫০ হাজার মানুষের ভাগ্য এখনো সম্পূর্ণ নির্ভর করছে প্রকৃতির ওপরই।
নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতির কথা শুনতে শুনতে হাজার হাজার হেক্টর আবাদি জমি পদ্মার বুকে হারিয়ে গেছে। এলাকাছাড়া হয়েছে মানুষ। ফলে চরাঞ্চলের ভৌগোলিক, সামাজিকসহ সার্বিক পরিবেশ আজ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
পদ্মা নদীর অববাহিকায় ৪টি ইউনিয়নের অবস্থান রয়েছে। এগুলো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর, পাঁকা ও দুর্লভপুর। এর মধ্যে উজিরপুর ইউনিয়নের ভূখণ্ডের ৭০ শতাংশই ইতিমধ্যে পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ওই ইউনিয়নের মানুষ এখন বিভিন্ন ইউনিয়ন ও উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছেন। শুধু কাগজে-কলমে ইউনিয়নের অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে তা এখন ধু-ধু বালুচর।
সম্প্রতি জানা গেছে, উজিরপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ আবাদি জমি দীর্ঘদিন ধরে বালুচরে পরিণত হয়ে থাকায় সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস কয়েক হাজার বিঘা জমির খাজনা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এ নিয়ে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এলাকাবাসী মানববন্ধন করলেও মেলেনি কোনো সুরাহা।
উজিরপুর ইউনিয়নের রাধাকান্তপুর এলাকার সাবেক বাসিন্দা মুসলেমা বেগম (৪৫)। একই এলাকায় ছিল বাবা ও শ্বশুরের বাড়ি। আনুমানিক ২০ বছর আগে পদ্মা নদীর গর্ভে এলাকাটি সম্পূর্ণ বিলীন হলে দুই পরিবারই চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বৃদ্ধ মা, এক শিশুসন্তান ও স্বামীসহ তিনি পাঁকা ইউনিয়নের চরপাঁকা জামাইপাড়া গ্রামে আশ্রয় নেন। বাঁশ ও খড় দিয়ে ঘর বেঁধে শুরু হয় নতুন জীবন। স্বামী বাবুল আকতার দিনমজুর হিসেবে সামান্য উপার্জনের পাশাপাশি মুসলেমা ঘরে বসেই সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। অল্প অল্প টাকা জমিয়ে সেলাই মেশিন কিনে বাড়ান আয়। একপর্যায়ে পরিবারটি পাঁকা ইউনিয়নের ভোলার তালিকাভুক্ত হয় এবং ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যানের সহযোগিতা পান।
কিন্তু পাঁকা চরাঞ্চলে আসার ২০ বছরের মধ্যে তিনবার তাদের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে আবারও ভাঙনের মুখে পড়ে বাড়ি করার মতো জমি জোগাড় করতে ব্যর্থ হন তারা। বাধ্য হয়ে পাঁকা ইউনিয়ন ছেড়ে অবশেষে তাঁরা জেলার রানীহাটি ইউনিয়নের সরকারি গুচ্ছগ্রামসংলগ্ন একটি আমবাগানে আশ্রয় নেন। মুসলেমা বেগম জানান, চরের প্রতিবেশীদের আপন করে নিলেও নদীর ভাঙন সে সুখ টিকতে দেয়নি। বারবার এই বিদায়ের যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়।
একইভাবে পাঁকা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আব্দুল মালেক বুদ্ধু কদমতলা গ্রামে বসবাস করতেন। গত বছর ব্যাপক নদীভাঙন শুরু হলে দিশেহারা হয়ে বসতবাড়ি সরাতে সরাতে এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। চরাঞ্চলের ঘরবাড়ির ভগ্নাংশ নিয়ে তিনি নাচোল উপজেলার পণ্ডিতপুরে চলে যান। বিদায়ের মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এলাকাবাসীর কাছে ক্ষমা ও দোয়া চেয়ে আবেগঘন বার্তা দেন, যা স্থানীয়দের হৃদয়কে নাড়া দেয়। তার বড় ছেলে শাহলাল বলেন, "আজ আমার মনটা যেন ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। সবাই থেকে গেল, অথচ আমি যেন সবার মাঝ থেকে হারিয়ে গেলাম।"
পাঁকা ইউনিয়নের গমের চর গ্রামের কৃষক মো. একরামুল হক (৬৬) জানান, জীবনের গত কয়েক দশকে তার অন্তত ২০ বার ঘরবাড়ি ভেঙেছে। নদীর ভাঙনে অতিষ্ঠ হয়ে তার বড় ছেলে ও বোনের পরিবারও বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছে। হলদিবোনা হাটের দোকানদার মো. ইব্রাহিম হোসেনও চরে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে নাচোল উপজেলার ভোলা মোড়ে দোকান ও বসতি সরিয়ে নিয়েছেন।
বিগত ৫ বছরের ভয়াবহ চিত্র ও ক্ষয়ক্ষতি
স্থানীয় জরিপ অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পদ্মানদীতে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ নদীভাঙন হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৫০০ পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তারা অধিকাংশই নাচোল উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকেই শিবগঞ্জ, রানীহাটি, বিনোদপুর, আটরশিয়া এবং সদর উপজেলার আমনুরা, বাবুডাইং ও সুন্দরপুর এলাকায় বসবাস করছেন।
পদ্মার খরস্রোতে তলিয়ে গেছে দক্ষিণ পাঁকা, তেরো রশিয়া, ডুবাইপাড়া, গমের চর, জামাইপাড়া, সরদারপাড়া, হাটপাড়া, মারাঙাপাড়া ও হিন্দুপাড়া সহ প্রায় ১৫টি গ্রাম। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে:
পাঁকা-নারায়ণপুর পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়, পাঁকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর পাঁকা সরদারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গমের চর প্রাথমিক বিদ্যালয়, হলদিবোনা হাট ও তেলিখাড়ি হাট, গমের চর কবরস্থান ও চর পাঁকা ঈদগাহ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মসজিদ ও মন্দির।
গত ৫ বছরে অত্র এলাকায় মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা এবং বিলীন হওয়া আবাদি জমির পরিমাণ ১ হাজার হেক্টর। বর্তমানে ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে প্রায় ৫০টি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ১টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ৫টি বিজিবি ক্যাম্প, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র, হাটবাজার, কবরস্থান এবং হাজার হাজার হেক্টর আবাদি জমি।
ভারতের গঙ্গা নদী বাংলাদেশের দুর্লভপুর ইউনিয়নে প্রবেশ করে পদ্মা নাম ধারণ করেছে। এই মোহনাঞ্চল থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ অবস্থিত। ভারি বর্ষায় পাহাড়ি ঢল নামলে ফারাক্কার শতাধিক গেট খুলে দেওয়া হয়, যার ফলে পদ্মা আরও বেশি খরস্রোতা হয়ে ওঠে এবং তীব্র ভাঙন শুরু হয়। বিগত কয়েক বছরে আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত একটানা ভাঙন চলায় এলাকাবাসী চরম হতাশ ও আতঙ্কিত।
স্থানীয় ছাত্র কবির হোসেন জানান, বিগত পাঁচ বছরে বর্ষার সময় শুধু অস্থায়ী জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হয়েছে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হলেও সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে আসেনি। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি—নদীভাঙন স্থায়ীভাবে প্রতিরোধ করা হোক।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম জানান, শিবগঞ্জ উপজেলায় পদ্মা নদীর পূর্বপাড়ের ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে পাস হয়েছে এবং টেন্ডারের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ৭৪৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ দুই সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হবে। পরবর্তীতে নদীর পশ্চিম পাড়েও বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
পাঁকা ইউনিয়নের দুইবারের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান বলেন, গত এক বছরে তার বসতভিটে দুবার নদীতে বিলীন হয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে পাঁকা চর সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যেতে পারে। তবে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি সঠিক সময়ে জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা গেলে হাজার হাজার পরিবারের স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও যখন হাজার হাজার মানুষ একটি স্থায়ী ঠিকানার নিশ্চয়তা পায় না, তখন প্রশ্ন থেকেই যায়—উন্নয়নের মহাসড়কে তাদের জন্য কি সত্যিই কোনো জায়গা আছে?
জেএস

আশফাকুর রহমান রাসেল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
© 2026 দৈনিক ডেসটিনি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।






