বিষখালী সেতুতে সুগম হতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমের নতুন অর্থনীতি

ছবি: ডেসটিনি প্রতিনিধি
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে বিষখালী নদীর ওপর একটি সেতু শুধু যোগাযোগের অবকাঠামো নয়, এটি বহু বছরের উন্নয়নের স্বপ্ন।
স্বাধীনতার পর থেকে অসংখ্য সরকার, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য পরিবর্তন হলেও বিষখালী নদীর ওপর স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি। ফেরিনির্ভর যোগাযোগের কারণে দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
অথচ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চল দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক করিডোরে পরিণত হওয়ার সব ধরনের সক্ষমতা ধারণ করে।
এমন বাস্তবতায় ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল বিষখালী নদীর বুকে দুটি কৌশলগত সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছেন। তিনি বিষয়টিকে শুধু একটি আঞ্চলিক দাবি হিসেবে দেখছেন না; বরং দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করছেন।
এ লক্ষ্যে তিনি রাজাপুর উপজেলার বড়ইয়া থেকে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতি বন্দর পর্যন্ত একটি সংযোগ সেতু নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন। একই সঙ্গে বরগুনার বেতাগী ও ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ার মধ্যবর্তী বিষখালী নদীর বেতাগী-কচুয়া পয়েন্টে সেতু নির্মাণের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগেও পৃথক ডিও লেটার পাঠিয়েছেন।
ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রস্তাব দুটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রাথমিকভাবে ডিপিপি প্রণয়নের কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।
বেতাগী-কচুয়া পয়েন্টে সেতু নির্মিত হলে পটুয়াখালীর পায়রা সমুদ্রবন্দর এবং খুলনার মোংলা সমুদ্রবন্দরের মধ্যে একটি নতুন ও সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে খুলনা, বেনাপোল ও মোংলা অঞ্চল থেকে ভাণ্ডারিয়া, কাঁঠালিয়া হয়ে পায়রা সমুদ্রবন্দর, লেবুখালী এবং কুয়াকাটায় পৌঁছানোর দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এর ফলে দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে পণ্য পরিবহন আরও দ্রুত, নিরাপদ ও কম খরচে সম্ভব হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দুটি সেতুর সবচেয়ে বড় সুফল আসবে শিল্পায়নে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হলে নদীর দুই তীরে গড়ে উঠবে নতুন নতুন শিল্পকারখানা, শিল্পপার্ক, গুদামজাতকরণ কেন্দ্র, কোল্ড স্টোরেজ, লজিস্টিক হাব, কৃষি ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন প্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে যেসব উদ্যোক্তা দক্ষিণাঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহী নন, সেতু নির্মাণের পর তাদের জন্য এ অঞ্চল একটি আকর্ষণীয় শিল্পাঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
বিশেষ করে বেপজা বাস্তবায়নাধীন পটুয়াখালী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (পটুয়াখালী ইপিজেড) এই সেতুর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোংলা ও পায়রা- দেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে দ্রুত সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলে ইপিজেডে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সহজে কাঁচামাল আমদানি করতে পারবে এবং উৎপাদিত পণ্য কম সময়ে বন্দরে পৌঁছে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।একই সঙ্গে ঝালকাঠি, বরগুনা, পিরোজপুর, বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিসিক শিল্পনগরীগুলোও নতুন প্রাণ ফিরে পাবে।
বর্তমানে সীমিত পরিসরে পরিচালিত অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বড় আকারে উৎপাদন ও রপ্তানির সুযোগ পাবে। নতুন নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, পরিবহন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুটি সেতু বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে উঠবে। পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্প, বাণিজ্য ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। এর সুফল শুধু ঝালকাঠি বা বরগুনা নয়, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, পটুয়াখালীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।
সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, "জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে দায়িত্ব দিয়েছে। তাই দিন-রাত আমি মানুষের উন্নয়নের কথাই ভাবি। ঝালকাঠি জেলার আর্থসামাজিক উন্নয়ন কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি। আমাদের প্রস্তাবিত দুটি সেতু বাস্তবায়িত হলে শুধু ঝালকাঠি নয়, দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দর সরাসরি যুক্ত হবে, অসংখ্য শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে।"
তিনি আরও বলেন, "এটি শুধু একটি সেতু প্রকল্প নয়, এটি দক্ষিণাঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত্তি। তাই বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি।"
সমাজ সংগঠক আতিকুর রহমান রুবেল বলেন , বিষখালী নদীর বুকে প্রস্তাবিত দুটি সেতু বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু দুই তীরকে সংযুক্ত করবে না; বরং দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলকে শিল্প, বাণিজ্য, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের নতুন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। বহু বছরের অবহেলিত এই অঞ্চল তখন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
ইউ

এইচ এম নাসির উদ্দিন, ঝালকাঠি প্রতিনিধি
© 2026 দৈনিক ডেসটিনি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।








