গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণমধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবির ঝুঁকি নিয়ে কেন অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধ শুরু করলেন ট্রাম্প?

ছবি: সংগৃহীত
গত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে নিজের স্বার্থ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে বড় বড় ঝুঁকি নেওয়াই ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বভাব। একের পর এক প্রতিষ্ঠিত প্রথা ও বিশ্বরাজনীতির নিয়ম ভেঙে তিনি সবসময় এক ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় মেতে থেকেছেন। ইতিহাস বলছে, তার এই কৌশলে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তিনি সফল হয়েছেন। একাধিকবার দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যেমন বিলিয়নিয়ার হয়েছেন, তেমনি অসংখ্য আইনি ও রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি পাশ কাটিয়ে দুই দুইবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে একসময়ের ক্যাসিনো মোগল খ্যাত এই মার্কিন নেতা এবার হয়তো তার প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ জুয়াটি খেলে ফেললেন। মাত্র এক মাস আগে স্বাক্ষরিত এক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে ট্রাম্প ১৯৩০-এর দশকের ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা মহামন্দার মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকানোর একমাত্র উপায় বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অথচ সেই চুক্তি স্বাক্ষরের মাস না পেরোতেই তিনি আবারও ইরানের সঙ্গে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের উসকানি দিলেন।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানি সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোতে নতুন করে বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনের আর চার মাসও বাকি নেই। এই নির্বাচনে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা ক্যাপিটল হিলের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে লড়ছে। এমন একটি সংবেদনশীল মুহূর্তে মার্কিন ভোটারদের কাছে চরম অজনপ্রিয় একটি যুদ্ধকে নতুন করে উসকে দিয়ে ট্রাম্প নিজের দলের জন্য বড় ধরনের নির্বাচনী বিপর্যয় ডেকে আনছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, এই সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে তীব্র মূল্যস্ফীতির প্রভাব ফেলবে।
নির্বাচনী প্রভাবে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ নিয়ে এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, ‘আমার কাছে মনে হয় এই সিদ্ধান্তটি ট্রাম্পের জন্য পুরোপুরি এক লোকসানকারী জুয়া। এটিই প্রমাণ করে যে ট্রাম্প আসলে মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে একটুও ভাবছেন না। ইরানের বিষয়ের ক্ষেত্রে তিনি আসলে উদীয়মান সূর্যের দিকে ডানা মেলে উগ্র অহংকারে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রিক পুরাণের ‘ইকারুস’-এর মতো আচরণ করছেন। ইরানিদের ওপর ট্রাম্পের ব্যক্তিগত শত্রুতা বা প্রতিশোধ নেওয়ার অন্ধ আকাঙ্খা থেকেই তিনি এমনটা করছেন।’
কেবল নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই আকাশপথের সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করলে তা একপর্যায়ে ইরানের ভূখণ্ডে সরাসরি পদাতিক মার্কিন সেনার স্থল অভিযানের দিকে রূপ নিতে পারে। আর এমন সিদ্ধান্ত ট্রাম্পকে সেই দীর্ঘস্থায়ী ও ‘অন্তহীন যুদ্ধের’ দিকেই ঠেলে দেবে, যা অতীতে তিনি নিজে কখনো জড়াবেন না বলে অঙ্গীকার করেছিলেন এবং যার জন্য সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টদের তীব্র সমালোচনা করতেন।
ইরানের সামরিক ঘাঁটিতে ট্রাম্পের এই বিমান হামলার নির্দেশকে খুব একটা ফলপ্রসূ বা দূরদর্শী মনে করছেন না খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশেষজ্ঞরা। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল জোসেফ ভোটেল মনে করেন, এমন সামরিক পদক্ষেপের কার্যকারিতা অত্যন্ত সীমিত। তার মতে, একটি টেকসই কৌশলের জন্য ওয়াশিংটনকে অবশ্যই কূটনীতির আশ্রয়ে ফিরে যেতে হবে। একই সঙ্গে ট্রাম্প তার গত মেয়াদে যেসব ন্যাটো মিত্রদের বারবার অপমান ও অবহেলা করেছেন, তাদের দিকেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
জেনারেল ভোটেল বলেন, ‘ইরান যেসব কৌশলগত জায়গায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে, আমাদের সেগুলোর ওপর বেশি নজর দেওয়া উচিত।’ তিনি মনে করেন, কিছু ক্ষেত্রে সামরিক আক্রমণ চালানো যেতে পারে, তবে বড় আঘাত এড়াতে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সেন্টকমের সাবেক এই প্রধান আরও যোগ করেন, ‘আমরা এখন সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে সমান তালে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ দেখছি। আমরা আঘাত করছি, তারাও পাল্টা আঘাত করছে। এটি দেখে আমি এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছাচ্ছি যে এই লড়াই হয়তো আরও কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে। এ জন্য দীর্ঘ কৌশলগত ধৈর্যের প্রয়োজন, যা এক বড় রাজনৈতিক ঝুঁকির বিষয়।’
দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পারস্য উপসাগরে একের পর এক সামরিক উত্তেজনা দেখা দিতে শুরু করে। উল্লেখ্য, এই সমঝোতা স্মারকটি মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির নব্য-রক্ষণশীল বা নিও-কনজারভেটিভদের কাছ থেকেও তীব্র সমালোচনার শিকার হয়েছিল। তারা একে ইরানের কাছে ট্রাম্পের ‘নতি স্বীকার’ বা ‘আত্মসমর্পণ’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। অন্যদিকে, ইরানও বসে থাকেনি; তারা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে দ্রুত পাল্টা জবাব দেয়।
মার্কিন নৌবাহিনীর প্রত্যক্ষ সুরক্ষায় উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যখন বিপজ্জনক ইরানি উপকূলীয় প্রণালীর পরিবর্তে নিরপেক্ষ ওমানের উপকূলীয় নৌপথ ব্যবহার করা শুরু করে, তখনই ইরান সেগুলোর ওপর হামলা চালায়। এর আগে ইরানি উপকূলে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তেহরান অবৈধ টোল বা ‘সার্ভিস ফি’ আদায় করত এবং জাহাজ চলাচলের গতি নিয়ন্ত্রণ করত। কিছু বিশ্লেষক এই সামরিক উত্তেজনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল দর-কষাকষির নীতিকেই দায়ী করছেন। তাদের মতে, চুক্তিতে বিকল্প নৌপথ ব্যবহারের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারা না থাকায় শুরুতেই এক ধরনের ধোঁয়াশা ও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল।
মার্কিন চিন্তা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি এন্ডোমেন্টের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ও তাত্ত্বিক ভালি নাসর বলেন, ‘এই সমঝোতা স্মারকটি ট্রাম্পের জন্য মূলত কিছু সময়ের রাজনৈতিক স্বস্তি পাওয়ার একটি অস্থায়ী হাতিয়ার ছিল। তার মূল উদ্দেশ্য হলো কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়া বা তা যেকোনো মূল্যে ইরানের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘ট্রাম্প আলোচনার টেবিলে চূড়ান্তভাবে বসার আগেই তাদের হাত থেকে এই অর্থনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিতে চান; যাতে তারা তাদের পরমাণু কর্মসূচি বা অন্য কোনো জাতীয় বিষয়ে ট্রাম্পের শর্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারে।’
ভালি নাসর মনে করেন, এই ইস্যুতে ইরানও একটি বড় বাজি ধরেছিল। ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিকে কাজে লাগিয়ে তারা স্থবির হয়ে পড়া কিছু আন্তর্জাতিক আমদানি সচল করতে চেয়েছিল, যাতে তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তি পায় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হয়।
তিনি বলেন, ‘এর মূল কথা হলো, এখানে দুই পক্ষের হিসেবেই চরম ভুল বা ভুল হিসাব-নিকাশ কাজ করেছে। তবে বিষয়টি কেবল সাধারণ কোনো ভুল বোঝাবুঝি ছিল না, ছিল নিখাদ কৌশলগত চাল।’
ইরান হরমুজ প্রণালীকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কার্ড হিসেবে ব্যবহার করতে যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। কারণ এর মাধ্যমে তারা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি সিংহভাগ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং পারস্য উপসাগরের ধনী আরব দেশগুলোকে এক অর্থে জিম্মি করতে পারে। ইরানের এই মরিয়া ভাব ট্রাম্পকে আরও বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করতে পারে। এর ফলে স্থল অভিযানসহ সংঘাত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। তবে যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যার মাধ্যমে যে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ বা রেজিম চেঞ্জের প্রকাশ্য উদ্দেশ্য ওয়াশিংটনের ছিল, তা আপাতত তাদের প্রাথমিক পরিকল্পনা থেকে বাদ পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা সোয়ানসন মনে করেন, ‘ট্রাম্প হয়তো কেবল একতরফা সামরিক শক্তির জোরেই সব হাসিল করতে পারবেন বলে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। আর সেখানে ব্যর্থ হয়ে তিনি এখন অন্য কোনো পথ খুঁজছেন। অন্যদিকে ইরানিরাও তাদের আঞ্চলিক প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর মাত্রাতিরিক্ত ভরসা করছে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘ হলে দুই পক্ষের প্রকৃত সামর্থ্য কতটুকু টিকবে, তা কেউ জানে না।’ ট্রাম্প প্রশাসনে অভিজ্ঞ ইরান বিশেষজ্ঞদের চরম শূন্যতার কারণে এই কূটনৈতিক ভুল বোঝাবুঝির ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হয়েছে।
ডানপন্থী সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার লরা লুমারের একটি সমালোচনামূলক টুইটের পর পররাষ্ট্র দপ্তরের চাকরি হারানো সোয়ানসন এই যোগ্য বিশেষজ্ঞদের অভাবের জন্য সরাসরি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে দায়ী করেছেন। সোয়ানসনের স্পষ্ট অভিযোগ, রুবিও সুকৌশলে পররাষ্ট্র দপ্তরের মূল বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকদের ‘সরিয়ে দিয়েছেন’।
বর্তমানে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’-এর জ্যেষ্ঠ সদস্য সোয়ানসন বলেন, ‘এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ভেতরের গোপন তথ্য ফাঁসের ঘটনাগুলো আমাকে অবাক করেছে। জানা গেছে, ইসরায়েল যখন ট্রাম্পের কাছে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যৌথ প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল, তখন রুবিও তা নিয়ে মনে মনে সংশয় প্রকাশ করলেও প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সামনে কিছুই বলেননি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিনি মূলত পুরো পররাষ্ট্র দপ্তরকে নিষ্ক্রিয় করে নিজে নীরব ছিলেন এবং গোপনে নিজেকে এই সিদ্ধান্তের ঐতিহাসিক দায় থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করেছিলেন।’ অভিজ্ঞ ইরান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বাতিল করে ট্রাম্প এখন তার বিশ্বস্ত ব্যক্তিগত দলের ওপর ভরসা করছেন। এই অনভিজ্ঞ দলে রয়েছেন তার প্রধান বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং সম্প্রতি জেডি ভ্যান্স যিনি যুদ্ধের শুরুর দিকের সামরিক সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধী ছিলেন।
লেখক পরিচিতি
রবার্ট টেইট যুক্তরাজ্যের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর ওয়াশিংটনভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সংবাদদাতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তার অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
সূত্র: এশিয়া পোস্ট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
© 2026 দৈনিক ডেসটিনি, সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।









